
কোরবানির ইতিহাস ও তাৎপর্য: হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ত্যাগে লুকিয়ে আছে ঈমানের শিক্ষা
নিজস্ব প্রতিবেদক:
কোরবানি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যার মূল শিক্ষা আত্মত্যাগ, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং তাকওয়া অর্জন। ইসলামী চিন্তাবিদ দুধরচকী ছাহেব তার বক্তব্যে কোরবানির ইতিহাস, তাৎপর্য ও শিক্ষা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা কোরআনে ঘোষণা করেছেন—“নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাওসার দান করেছি। অতএব, আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কোরবানি করুন” (সূরা আল কাওসার ১০৮:১-২)। রাসূল (সা.)-ও কোরবানির গুরুত্ব সম্পর্কে বহু হাদিসে নির্দেশনা দিয়েছেন।
কোরবানির অর্থ ও ব্যাখ্যা:
বাংলায় ‘কোরবানি’ শব্দের অর্থ হলো আল্লাহর নৈকট্য অর্জন বা সান্নিধ্য লাভ করা। কোরআনের ভাষায় ‘নাহার’ শব্দ দ্বারা কোরবানিকে বোঝানো হয়েছে, যার অর্থ নির্দিষ্ট নিয়মে পশু জবাই করা বা প্রিয় বস্তু ত্যাগ করা।
কোরবানির প্রাচীন ইতিহাস:
দুনিয়ার শুরু থেকেই কোরবানির প্রচলন রয়েছে। হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র কাবিল ও হাবিলের কোরবানির ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে প্রথম কোরবানির নজির। হাবিলের কোরবানি কবুল হলেও কাবিলেরটি প্রত্যাখ্যাত হয়, যা পরবর্তীতে মানব ইতিহাসের প্রথম হত্যাকাণ্ডের দিকে নিয়ে যায়।
ইব্রাহিম (আ.)-এর কোরবানির ঘটনা:
বর্তমান কোরবানির প্রথা মূলত মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর অনুসৃত সুন্নাত। আল্লাহর নির্দেশে তিনি তার প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে প্রস্তুত হন। পিতা-পুত্রের এই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ আল্লাহর কাছে সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত হয়। পরবর্তীতে আল্লাহ তায়ালা ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি পশু কোরবানি হিসেবে গ্রহণ করেন।
হজরত হাজেরা (আ.) ও জমজম কূপের ঘটনা:
ইসমাইল (আ.)-এর শৈশবে আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) স্ত্রী হাজেরা (আ.) ও শিশুপুত্রকে মরুভূমিতে রেখে আসেন। পানির সন্ধানে হাজেরা (আ.) সাফা-মারওয়া পাহাড়ে দৌড়াদৌড়ি করেন। সেই ঘটনার ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি হয় জমজম কূপ, যা আজও মুসলিম বিশ্বের অন্যতম পবিত্র নিদর্শন।
কোরবানির গুরুত্ব ও ফজিলত:
রাসূল (সা.) বলেছেন, কোরবানির দিনে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো কোরবানি। কোরবানির পশুর প্রতিটি লোমের বিনিময়ে নেকি দেওয়া হয়। এটি কেবল পশু জবাই নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রতীক।
কোরবানির শিক্ষা:
কোরবানি আমাদের শেখায়—
-আল্লাহর নির্দেশের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য
-প্রিয় বস্তু ত্যাগের মানসিকতা
-আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জন
-দানশীলতা ও সামাজিক সহমর্মিতা
এছাড়া কোরবানির গোশত আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মাঝে বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
কোরবানি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা:
কোরবানি সচ্ছল মুসলমানদের ওপর ওয়াজিব। গরু, মহিষ বা উটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাতজন অংশীদার হতে পারেন, তবে তাদের আর্থিক সামর্থ্য ও নিয়ত এক হওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোরবানির সঙ্গে আকিকার অংশ যুক্ত করা শরিয়তসম্মত নয়। আকিকার জন্য আলাদা পশু নির্ধারণ করতে হবে।
দুধরচকী ছাহেব বলেন, কোরবানি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়, বরং এটি ঈমান, ত্যাগ ও মানবিকতার এক অনন্য শিক্ষা।
তিনি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, যেন সবাই কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেদের জীবনকে আলোকিত করতে পারে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তাওফিক দান করুন—আমিন।
লেখক: জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম সিলেট এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি,সাবেক: ইমাম ও খতীব হযরত দরিয়া শাহ্ রহ. মাজার জামে মসজিদ কদমতলী সিলেট। বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ লেখক ও কলামিস্ট সাংবাদিক হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী ছাহেব।
