গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের জিকাবাড়ি গ্রাম। ওই গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে ঠারুনতলা নামে একটি স্থান রয়েছে। সেখানে রাস্তার পাশের একটি গাছে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পূজা করে থাকেন।
গাছের পাশে রয়েছে একটি পুকুর। সেই পুকুরপাড়ের মাটির নিচ থেকে অলৌকিকভাবে লাল রক্ত বের হচ্ছে বলে দাবি করছেন ওই এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বী লোকজন। গত শনিবার (৫মে) সকাল থেকেই প্রতিদিন শত শত উৎসুক মানুষ স্থানটি দেখতে ভিড় করছে।
যে গাছে পূজা দেওয়া হয় সেখানে দেবতা রয়েছে বলে দাবি করে পূজা দিচ্ছেন আগতরা। এটি অলৌকিক নাকি লৌকিক- এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। প্রতিদিনই উৎসুক মানুষের ভিড়ও ক্রমাগত বাড়ছে।
গত শনিবার শুরু হওয়া এই ঘটনা নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ওই পুকুর ও রাস্তায় ধূপ জ্বালিয়ে ও ঢাক ঢোল বাজিয়ে পূজা করছে। একটি ঝিকা গাছে লাল সাদা শাড়ি পেঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, এই স্থানে তাদের দেবতা রয়েছে।
স্থানীয়দের মধ্যে এ স্থানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে অনেক কল্পকাহিনী রয়েছে। দেশ স্বাধীনের পর তৎকালীন চেয়ারম্যান ঠারুনতলা পুকুরের পাড় দিয়ে ডোমরাকান্দি-গোয়ালগ্রামে রাস্তাটি নির্মাণ করেন। দীর্ঘ ১৪ কিলোমিটার রাস্তার কোথাও কিছু না হলেও ঠারুনতলায় এলাকার ৪০-৪৫ ফুট রাস্তা ভেঙে দেবে যায়। সেখানে যতবার মাটি দেওয়া হয়েছে ততবারই ওই স্থানটি দেবে গেছে।
জিকাবাড়ি গ্রামের ঠারুনতলা স্থানের গোবিন্দ কির্তনীয়া, প্রমথ বিশ্বাস, চিত্ত রঞ্জন বিশ্বাস, বিভূতি বিশ্বাসসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, রাস্তাটি নির্মাণের পর থেকে ভাঙা অংশে ১৫ থেকে ১৬ বার মাটি কেটে ঠিক করা হয়েছে। কিছুদিন ভালো থাকার পর আবার দেবে যায়। কোনোভাবেই ভাঙা ঠেকানো যায়নি।
এত মাটি কোথায় দেবে যায় তাও বোঝা যায় না। সম্প্রতি সরকারিভাবে রাস্তাটি পাকা করার কাজ শুরু করলে ওই স্থানটি আবার দেবে যায়। তখন ঠিকাদার ভাঙা স্থানে পাইলিং করে মাঠি ও বালু দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে পাইলিংয়ের কাজ শুরু করেন। কাজ শুরু হওয়ার পর ১০ ফুট নিচে যাওয়ার পর আর সেখানে পাইলিং যায় না। পরে দেখা গেল ওই স্থানের প্রায় এক শ ফুট জায়গা নিয়ে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং সেসব ফাটল দিয়ে কখনো লাল কখনো গোলাপি রঙের তরল বের হয়। তখন মিস্ত্রিরা পাইলিংয়ের কাজ বন্ধ করে দেন।
ওই গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ চিত্ত রঞ্জন বিশ্বাস (৭২) বলেন, ওই স্থানে পাকিস্তান আমল থেকে বুড়োমার পূজা শুরু হয়। সেইসময় পাঠা বলি দেওয়া হতো। দুই দিন মেলা হতো। এখন মেলা বন্ধ রয়েছে। তবে প্রতিবছর বুড়োমার পূজা হয়ে আসছে। দেশ স্বাধীনের পর থেকে যতজন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন ততবার এখানে মাটি ভরাট করেছেন। কিন্তু কেউই রাখতে পারেননি। আমার ধারণা অলৌকিক কিছু না থাকলে এত মাটি কোথায় যাবে। তাই আমরা গ্রামবাসী ভেবেছি দেবে যাওয়া স্থানে গ্রামবাসী সবাই মিলে পূজা করে বুড়োমার কাছে ক্ষমা চাইবো।
এ ব্যাপারে মাহমুদপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুদ রানা বলেন, ‘স্থানটি অনেকবার মেরামত করা হয়েছে, কিন্তু, মাটি থাকে না। পাইলিং করার সময় রক্ত বের হচ্ছে- এমন সংবাদ এলাকাবাসীর কাছ থেকে জানতে পেরে আমিও গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে প্রায় এক শ ফুট এলাকা জুড়ে লাল ও গোলাপি রঙের পানি দেখতে পাই।’ তিনি বলেন, ‘আমি একজন বাস্তববাদী মানুষ। তারপরও সেদিন অবস্থা দেখে আমিও কেন জানি না বিশ্বাস করতে শুরু করেছি, এখানে অলৌকিক কিছু আছে।’
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাশিয়ানীর উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবু সিদ্দিক খন্দকার ও মো. জিন্নাহ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা রাস্তার নির্মাণের কাজ করতে গেলে ওই স্থানে মাটি বার বার দেবে যাচ্ছিল। পরে পাইলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে আমরা জানতে পারি ওই স্থান দিয়ে লাল পানির মতো বের হচ্ছে। এই খবরে স্থানীয়রা সেখানে ভিড় করে। ঢাক ঢোল বাজিয়ে পূজা পার্বন শুরু করে। আমাদের ধারণা সেখানে চোরাবালির কারণে এই সমস্যা হচ্ছে। এই কারণে আপতত কাজ বন্ধ রয়েছে। বিশেষজ্ঞ কোনো ইঞ্জিনিয়ার দল স্থানটি পর্যবেক্ষণ করে যে সিদ্ধান্ত দেবে আমরা সেভাবে সামনের দিকে এগোবো।’

