DESK NEWS-
বর্তমান বিশ্বের প্রায় প্রতিটি মহাদেশেই নিপীড়ন, জাতিগত সংঘাত, বর্ণবাদী আচরণ বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে যুদ্ধপরিস্থিতি বিরাজ করছে। যার ফলে অনেক দেশেই মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, জীবন বাঁচানোর জন্য এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। আর এসবের ফলে বিশ্বব্যাপী শরণার্থী সমস্যা ক্রমশ প্রকট হচ্ছে, বাড়ছে রাষ্ট্রপরিচয়হীন মানুষের সংখ্যা। আধুনিক বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সংকটে পরিণত হয়েছে এটি।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন ইউএনএইচসিআর -এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বে রাষ্ট্রহীন অবস্থায় রয়েছে দেড় কোটিরও বেশি লোক। এছাড়া বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষের সংখ্যা পৌঁছেছে ৭ কোটি ৮০ লাখে।
স্বাধীন দেশে জন্ম নিয়েও নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত এরা। কোনো ধরনের সুরক্ষা বা আইনি অধিকার ছাড়াই মানবেতরভাবে বেঁচে থাকতে হচ্ছে তাদের। চলুন জেনে নেয়া যাক, কোথায় আছে রাষ্ট্রপরিচয়হীন এই মানুষেরা।
১৯৮২ সালে বৌদ্ধ প্রধান মিয়ানমারে নাগরিকত্ব নিয়ে একটি আইন পাশ হয়। আর তাতেই নাগরিকত্ব হারায় মুসলিম প্রধান রোহিঙ্গারা। জাতিগত সহিংসতার শিকার হয়ে অনেক রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হন। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয় মানবিক বাংলাদেশ। জনসংখ্যার চাপে থাকা ছোট্ট দেশটিতে প্রায় দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
নাগরিক সুযোগ বঞ্চিত সাড়ে ৪৭ হাজার মানুষের আবাস ইরাক। এদের মধ্যে আছেন, ঐতিহাসিকভাবে ইরাক-ইরান সীমান্তে বসবাসকারী কুর্দ, ফিলিস্তিনের শরণার্থী আর বেদুঈনরা।
১৯৬২ সালের কথা। আরবকরণের প্রক্রিয়ায় বলি হয়ে, নাগরিকত্ব হারান কুর্দরা। গৃহযুদ্ধের আগে অন্তত তিন লাখ কুর্দ হয়ে পড়ে দেশহীন। জাতিসংঘের হিসেব মতে, এখনো সিরিয়ায় নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত হয়ে বাস করছে ১ লাখ ৬০ হাজার কুর্দ। অনেকে বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছে।
১৯৬১ সালে স্বাধীনতা এলেও নাগরিক স্বীকৃতি জোটেনি যাযাবর জীবনে অভ্যস্ত বেদুঈনদের। জাতিসংঘের তথ্য মতে, ৯২ হাজার বেদুঈন আছে কুয়েতে। যারা বিনামূল্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং চাকরির মতো নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত।
ছয় লাখ ৯২ হাজার ঠিকানা বিহীন মানুষকে ঠাঁই দিয়েছে আইভোরি কোস্ট। বুরকিনা ফাসো, মালি, ঘানা থেকে এই লোকগুলো এসছে আইভোরি কোস্টে। দেশটির কফি এবং তুলা চাষের সঙ্গে জড়িয়ে কোনোরকম দিন যাপন করছে নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত এসব মানুষ। দেশটির মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ বিদেশি নাগরিক। যারা এখন বাস্তুচ্যুত।
চার লাখ ৭৯ হাজার রাষ্ট্রহীন মানুষের বসতি থাইল্যান্ডে। পাহাড়ি নৃগোষ্ঠী ইয়াও, হ্যামং এবং কারেন সম্প্রদায়ের মানুষ এরা। মিয়ানমার এবং লাওস সীমান্তবর্তী পর্বত এলাকায় তাদের অস্থায়ী আবাস।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে বাল্টিক রাষ্ট্র গঠন হলে, কপাল পোড়ে অন্তত দুই লাখেরও বেশি মানুষের। কারণ তাদের আর কোনো ঠিকানা নেই, কোনো বসতি নেই। তাদের দুই লাখ ২৫ হাজার আছেন লাটভিয়াতে আর ৭৮ হাজার আছেন ইস্তোনিয়ায়।
অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে, ২০১৩ সালে জাতীয়তা বিষয়ক আইনে পরিবর্তন আনার পর, আদালত থেকে রুল জারি করা হয়। আর তাতেই অনেকেই হয়ে যান দেশহীন। এমনকি, হাইতি থেকে আসা অনেক মানুষ ডমিনিকে জন্ম নিলেও মেলেনি নাগরিকত্ব। জাতিসংঘের ২০১৫ সালের হিসেব বলছে, এখানে রাষ্ট্রহীন মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৩৪ হাজার।
ভারতীয় বংশোদ্ভুত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রোমা। এই সম্প্রদায়ের হাজার দশেক মানুষের বাস, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে। তারাও আছেন নাগরিকত্ব সংকটে। চেকোশ্লাভাকিয়া ও যুগোশ্লাভিয়া ভেঙে গেলে, তাদের পরিচয় দিতে অস্বীকৃতি জানায় নতুন রাষ্ট্র। কসভো আর বসনিয়ায় ঠাঁই নেয়া রোমারাও যুদ্ধের কারণে পরিচয় সংকটে পড়ে যান।
ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে অনেক মানুষ পাড়ি জমান কলম্বিয়ায়। যাদের মাধ্যমে পৃথিবীতে এসেছে অন্তত ২৫ হাজার শিশু। তারাও আছে পরিচয় সংকটে। কারণ, কলম্বিয়া নাগরিকত্ব পেতে বাবা-মায়ের মধ্যে একজনের সে দেশের নাগরিকত্ব থাকতে হয়।
\সূত্র: ইউএনএইচসিআর

