নিজেরা নারিপ,তাই ছিনতাইয়ের টার্গেট হতো নারীরাই - সময় সংবাদ | Popular Bangla News Portal

Breaking

Post Top Ad

Responsive Ads Here

বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২১

নিজেরা নারিপ,তাই ছিনতাইয়ের টার্গেট হতো নারীরাই


  


জেলা প্রতিনিধিঃ



নিজেরা নারী হওয়ায় নারীরাই তাদের টার্গেট। চট্টগ্রাম নগরীর ব্যস্ততম সড়কগুলোর সুবিধামতো জায়গায় নেন অবস্থান। এরপর একা চলা নারীদের অনুসরণ করেই সুযোগ বুঝে করেন ছিনতাই। এক্ষেত্রে একের পর এক অভিনব কৌশলও অবলম্বন করেন তারা। তাদের হাতে পড়ে এ পর্যন্ত সর্বস্ব হারিয়েছেন অনেকেই। তবু যেন থামানো যাচ্ছে না তাদের দৌরাত্ম্য।

বিস্ময়করভাবে নগরীতে গত কয়েক বছর ধরে পুলিশের হাতে ধরা পড়া বেশিরভাগ নারী ছিনতাইকারীর বাড়িই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে। তাদের প্রায় সবাই পরস্পরের আত্মীয়। অন্যদিকে, কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে আসা নারী ছিনতাইকারীরাও সক্রিয় রয়েছেন নগরজুড়ে।


রোববার দুপুরে নগরীর আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরছিলেন রিফাত শামীম। লালদিঘি এলাকায় পৌঁছালে তাকে ঘিরে ধরেন কয়েকজন নারী। তারা ভয়ভীতি দেখিয়ে তার গলায় থাকা স্বর্ণের চেইনটি ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যান।


এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ করলে সোমবার নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিন নারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তারা হলেন- কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কুড়িপাড়া মজিদ চেয়ারম্যান বাড়ির সুজন শেখের স্ত্রী পাপিয়া বেগম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার ধরমণ্ডল পোকন চন্দ্র বাড়ির বাদলা মিয়ার স্ত্রী রুমা আক্তার ও একই উপজেলার দৌলতপুর এলাকার তাজু মেম্বারের বাড়ির মো. সেলিমের স্ত্রী জোসনা বেগম। এর মধ্যে পাপিয়ার বিরুদ্ধে আগের তিনটি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
















গত বছরের ১৭ অক্টোবর সকালে খুলশী রেলক্রসিং থেকে একেখান যেতে লেগুনায় ওঠেন তরু চৌধুরী। তাকে টার্গেট করে যাত্রীবেশে লেগুনাটিতে ওঠে বসেন পাঁচ নারী ছিনতাইকারী। একপর্যায়ে তাদের একজন তরু চৌধুরীর গায়ে বমি করার অভিনয় করেন। এতে তিনি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লে ছিনতাইকারীদের একজন মুহূর্তেই তার গলায় থাকা চেইনটি খুলে নিয়ে নেন।


গাড়ির সামনের দিকে চালকের পাশের আসনে বসা ছিলেন তরু চৌধুরীর ভাগ্নে হারাধন দত্ত। চালক ও হারাধন দত্ত বিষয়টি বুঝতে পারলে গাড়িটি থামান। ওই সময় ছিনতাইকারীরা নেমে পালানোর চেষ্টা করলে স্থানীয়দের সহযোগিতায় তিনজনকে ধরে ফেলা হয়। পরে তাদের নিয়ে যায় খুলশী থানা পুলিশ।


তারা হলেন- রুবিনা, শাহানা বেগম ও রিপা আক্তার। তারা সবাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা। এর মধ্যে রুবিনা ও শাহানা বেগমের বিরুদ্ধে আগের মামলা রয়েছে।


একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুরে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে আড়াই মাস বয়সী শিশুকে টিকা দিয়ে বাসায় ফিরছিলেন খাদিজা আক্তার। আন্দরকিল্লার মল টোয়েন্টিফোর শপিং কমপ্লেক্স এলাকায় পৌঁছালে তাকে ঘিরে ধরেন সাত নারী। তারা খাদিজার ভ্যানিটি ব্যাগটি ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যান। পরে ওই ঘটনায় অভিযান চালিয়ে সাত নারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।


গ্রেফতাররা হলেন- রিমা আক্তার, বিলকিস বেগম, রুমা আকতার, রহিদা বেগম, ববিতা বেগম, পাপিয়া ও সাথী আক্তার শান্তা। এর মধ্যে রিমা আক্তার, বিলকিস বেগম ও রুমা আকতারের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে। বাকি চারজনের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে।


২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল নগরীর কোতোয়ালি থানার লালদিঘি এলাকায় এক নারী সংবাদকর্মীর গলার চেইন ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যান দুই নারী ছিনতাইকারী। ঘটনার পরপর অভিযান চালিয়ে রুবিনা ও জান্নাত আক্তার নামে দুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। উদ্ধার করা হয় চার আনা ওজনের স্বর্ণের চেইনটিও। গ্রেফতার দুজনই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার বাসিন্দা। মূলত পথচারীদের টার্গেট করে গায়ে পড়ে ঝগড়া শুরু করতেন তারা। এরপর একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে টাকা, মোবাইলসহ দামি জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়ে যেতেন। 


চলতি বছরের ৩১ জুলাই রাতে নগরীর আগ্রাবাদ এলাকা থেকে ফারজানা বেগম নামে এক নারীকে গ্রেফতার করে ডবলমুরিং থানা পুলিশ। ফারজানা সবার কাছে নিজেকে টিকটক ও লাইকি মডেল হিসেবে জাহির করলেও আসলে তিনি একজন দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী। ধরা পড়ার আগেই তার বিরুদ্ধে আটটি মামলা ছিল বলে জানিয়েছিল পুলিশ।


কিশোরদের নিয়ে নিজস্ব একটি ছিনতাইকারী দলও রয়েছে ফারজানার। তার টার্গেট থাকতো নারী-পুরুষ উভয়ই। তবে দুই ক্ষেত্রে অবলম্বন করতেন আলাদা আলাদা কৌশল। সাধারণত একা চলাচল করা ছেলেদের টার্গেট করে ঠিকানা জিজ্ঞেস করার নামে থামাতেন। এরপর ছোরা দেখিয়ে সঙ্গে থাকা টাকা, মোবাইলসহ দামি জিনিসপত্র হাতিয়ে নিতেন। কেউ দিতে না চাইলে দিতেন ইভটিজিং ও যৌন হেনস্থার অভিযোগ আনার হুমকি। এ অবস্থায় অনেকে সম্মানহানির ভয়ে সবকিছু দিয়ে চলে যেতেন। একইভাবে ঠিকানা জিজ্ঞেস করার নামে থামাতেন মেয়েদেরও। এরপর ছোরার ভয় দেখিয়ে সবকিছু ছিনিয়ে নিতেন।


ফারজানার স্বামী রুবেলও ছিনতাইকারী দলের একজন সক্রিয় সদস্য। ফারজানাকে গ্রেফতারের কয়েকদিন আগেই অস্ত্র ও ছোরাসহ রুবেলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন থানায় ১১টি মামলা রয়েছে বলে জানায় পুলিশ। মূলত স্বামী-স্ত্রী মিলেই সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী দল গড়ে তোলেন। চলতি বছরের ১৯ জুলাই নগরীর আন্দরকিল্লা মোড়ে ঘটে যাওয়া একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়েই বেরিয়ে আসে তাদের তথ্য।


শুধু নগরী নয়, বিভিন্ন উপজেলায়ও রয়েছে নারী ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য। গত বছরের ৭ নভেম্বর মিরসরাই উপজেলার বারইয়ারহাট এলাকায় এক নারীর গলার চেইন ছিনতাইয়ের চেষ্টাকালে পাঁচ নারীকে ধরে ফেলে স্থানীয়রা। পরে তাদের থানায় সোপর্দ করা হয়।


সেই পাঁচজন হলেন- কহিনুর আক্তার, সৈয়দা বেগম, রোজিনা বেগম, রুনা আক্তার ও তাছলিমা আক্তার। এর মধ্যে তাছলিমা আক্তার হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার এবং বাকিরা নাসিরনগর উপজেলার বাসিন্দা।


২০১৮ সালের ৩০ জুন সীতাকুণ্ডে অভিযান চালিয়ে ছয় নারী ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। তারা হলেন- আফিয়া বেগম, ফুলতারা বেগম, সাহার বানু, সুলতানা বেগম, নাজমা বেগম ও মরিয়ম বেগম। তারা পরস্পর আত্মীয় এবং সবাই নাসিরনগর উপজেলার বাসিন্দা।


যাত্রীবেশে বাসে ওঠে জটলা তৈরি করে ছিনতাই করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। একইভাবে নগরীতে একটি যাত্রীর চেইন ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টাকালেই ধরা পড়েন রাহেলা নামে একজন। এরপরই তার দেওয়া তথ্যে বাকি ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়।


কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন বলেন, সংঘবদ্ধ এসব নারী ছিনতাইকারীদের ধরতে আমরা সবসময় তৎপর। এরই মধ্যে অনেককে ধরে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে টেরিবাজার, সিনেমা প্যালেস, আন্দরকিল্লাসহ কয়েকটি এলাকায় তারা সক্রিয়। সেসব এলাকা আমাদের নজরদারিতে রয়েছে।

Post Top Ad

Responsive Ads Here