![]() |
অস্থির চালের বাজার | সময় সংবাদ |
জেলা প্রতিনিধি:
করোনার ধকল সামলে উঠতেই মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। কয়েকমাস ধরেই ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বাজারের বেশিরভাগ পণ্যের দাম। অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির ফলে নাকাল স্বল্প আয়ের মানুষ। ইতোমধ্যে রাজশাহীর বাজারগুলোতে সবজির দাম ফের বাড়তে শুরু করেছে। তেলের পাগলা ঘোড়ার সাথে অস্থির হয়েছে চালের বাজার। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে দাম বেড়েছে ৩-৪ টাকা। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মিনিকেট ও নাজিরশাইল চালের দাম।
ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে ধানের দাম বেড়েছে। বাধ্য হয়েই তাদের এইসব চালের দাম বাড়াতে হয়েছে। আর খুচরা ব্যবসায়ীদের চালের দাম বাড়নোতে হাত নেই। সবকিছু হয় অদৃশ্য সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। সরকার সবকিছু মনিটরিং করছে ঠিকই কিন্তু কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। হাতের নাগালের বাইরে চালের সিন্ডিকেট।
দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে চালকল মালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কথার ভিন্নতা পাওয়া যাচ্ছে। একের দোষ অপরের ঘাড়ে চাপাতেই ব্যস্ত এ দুটি মহল।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত দাম পাবার আশায় চাল মজুদ করে রাখছেন মিল মালিকরা। চালের দাম বাড়ানোর নেপথ্যে একটা অদৃশ্য সিন্ডিকেট কাজ করছে। জনগণকে জিম্মি করে এক শ্রেণীর অসাধু মিল মালিকরা মুনাফা করতে চায়।
ধান-চাল মজুদের কথা স্বীকার করেছেন খোদ খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। বোরো ২০২২ মৌসুমে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ ও বাজার মনিটরিং সংক্রান্ত অনলাইন মতবিনিময় সভায় খাদ্যমন্ত্রী বলেন, অধিকাংশ মিল মালিক বাজার থেকে ধান কিনলেও তারা উৎপাদনে যাচ্ছেন না। বাজারে নতুন চাল এখনও আসছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন বাজারে যে চাল পাওয়া যাচ্ছে তা গত বছরের পুরাতন চাল।
তাহলে নতুন ধান যাচ্ছে কোথায়? মিল মালিকদের প্রতি এ প্রশ্ন রাখেন মন্ত্রী। এ অবস্থা চলতে দেওয়া হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, কে কত পরিমান ধান কিনছেন এবং কে কত পরিমান চাল ক্রাসিং করে বাজারে ছাড়ছেন তা খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের রিপোর্ট আকারে প্রেরণ করতে হবে। বিভিন্ন কর্পোরেট হাউস ধান চালের ব্যবসা শুরু করেছে। তারা বাজার থেকে ধান কিনে মজুত করছেন এবং প্যাকেটজাত করছেন। প্যাকেটজাত চাল বেশি দামে বাজারে বিক্র্ওি হচ্ছে। এসময় ধান চালের ব্যবসায় সম্পৃক্ত কর্পোরেট হাউসগুলোর সাথে দ্রুততম সময়ে বৈঠক করতে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন মন্ত্রী।
অপরদিকে এমন অভিযোগ মানতে নারাজ মিল মালিকরা। তারা বলছেন, করোনায় অনেক মিল বন্ধ হয়ে গেছে। তাছাড়া ধানের দাম অন্যান্য দু-পাঁচ বছরের চেয়ে বেশি। বেশি দামে ধান কেনার কারনে বেশি দামে চাল বিক্রি করতে হচ্ছে। তাছাড়া মিল মালিকদের অবৈধভাবে চাল গুদামজাত করার কোন সুযোগ নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মিল মালিক বলেন, আসলে সরষে ফুলেই ভুত লুকিয়ে আছে। দেশে যে পরিমান ধান উৎপাদন হয় তা দিয়ে দেশে চাল আমদানির মানে হয় না। বরং আমরা রফতানি করতে পারি।
গত বছর চালের দাম বেড়ে গেলে বিভিন্ন জায়গায় চালকল মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছিল। সেই সময় দাম কমেছে তাহলে আবার কেন দাম বাড়ছে? সরকার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাতে জনগণকে সঁপে দিয়েছে। কোন তদারকি নেই, বাজার মনিটরিং নেই। কারণ, ঘুড়ির নাটাই তাদের হাতে।
নগরের মাস্টারপাড়া কাঁচাবাজারের চাল ব্যবসায়ী সুশীল কুমার বলেন,‘ চালের দাম বাড়ছে। আমরা আড়তে গিয়ে চাল পাচ্ছি না। ধানের দাম বাড়ার কারনে চালের দাম বাড়তি। এক সপ্তাহ আগের চেয়ে বর্তমানে প্রতিকেজি চালে বেড়েছে ৪-৫ টাকা।
মিনিকেট চাল ৬০ টাকা বিক্রি হলেও এখন ৬৫ টাকা। আঠাস ৫০-৫২ টাকা থেকে বেড়ে ৫৮ টাকা, জিরাশাইল ৪ টাকা বেড়ে ৬০ টাকা হয়েছে। তাছাড়া অন্যান্য চালের কেজিতে বেড়েছে ১০-১২ টাকা। বাজারে বাসমতি ৮০ টাকা, নাজিরশাইল ৬০ টাকা থেকে ৭৫ টাকা, কাটারিভোগ সিদ্ধ ৭০ টাকা, স্বর্ণা ৪০-৪২ টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে ৪৮ টাকা, গুটিস্বর্ণা ৪৫, কালজিরা আতব ৯০ টাকা থেকে ১০ টাকা বেড়ে ১০০, চিনিগুঁড়া ১০০ টাকা থেকে ১১০, কাটারি আতপ ৭০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া বাজারে উধাও মোটা স্বর্ণা ও চায়না ইরি চাল। দু-এক দোকানে দেখা মিললেও ৪৫-৪৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চালের দাম বাড়ার পেছনে অসাধু চালকল মালিক, পাইকারি ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কারসাজি থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা।
তাঁদের মতে, চালের মোকাম ও মিলগুলোতে কারসাজি করে চালের দাম নির্ধারণ করা হয়। খুচরা ব্যবসায়ীদের পকেটে লাভের টাকা আসে না। যা যায় সিন্ডিকেট আর পাইকারি ব্যবসায়ীদের পকেটে। অল্প দাম থাকলে খুচরা ব্যবসায়ীদের বেশি সুবিধা হয়।
এদিকে চালের দাম বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ জনগণ। তাঁদের দাবি, চালের বাড়তি দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের উচিত শীঘ্রই একটা পদক্ষেপ গ্রহণ করা। মিল মালিকদের সঙ্গে বসে যদি সুরাহা না করা যায় তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।

