কুতুব উদ্দিন রাজু,চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানাধীন অক্সিজেন মোড়ে এক ভুয়া ডাক্তারের অনুসন্ধান পাওয়া যায়। ডিগ্রী না থাকা সত্বেও বাহারি ডিগ্রী নামের সাথে যুক্ত করে দীর্ঘ সাত বছর যাবত সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করে চিকিৎসাসেবা ও রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। অক্সিজেন কাঁচাবাজার মোড়স্থ নাহার মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় ‘ফেইথ ডেন্টাল সার্জারি’ নামে আলিশান চেম্বার খুলে রোগীদের সাথে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বায়েজিদ থানাধীন অক্সিজেন পুলিশ ক্যাম্প এর ৫০ গজ দূরত্বে কিভাবে একজন ভুয়া চিকিৎসক চেম্বার করছে ভুক্তভোগী জনসাধারণের প্রশ্ন!
এদিকে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরীর জন্য সংবাদ প্রতিনিধিদল সরেজমিনে উক্ত ভুয়া ডাক্তারের চেম্বারে গেলে দেখতে পাওয়া যায়, তার আলিশান চেম্বারে দিব্যি বসে আছে। প্রতিবেদক ভুয়া চিকিৎসকের কাছে বাহারি ডিগ্রী এবং ডেন্টাল সার্জন এর বিষয়ে জানতে চাইলে ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট দেখাতে বললে তিনি মোবাইল ফোনে কথা বলার ভান ধরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় উক্ত ভুয়া চিকিৎসক জনৈক সাংবাদিক মানিককে ফোন করেন আবার তাকে না পেয়ে আওয়ামী লীগ নেতা লেদু কে ফোন করেন। এক পর্যায়ে লেদু কেও মোবাইল ফোনে না পেয়ে তার স্ত্রীকে ঘর থেকে ডেকে আনেন। ভুয়া ডাক্তারের একি কাণ্ড! বাসায় সার্টিফিকেট রয়েছে বললেও তার স্ত্রী সার্টিফিকেট না এনে হাফিয়ে ফুফিয়ে চেম্বারে ঢুকে পড়লো এবং সাংবাদিকদের রাজনৈতিক নেতার প্রভাব দেখিয়ে শাসানোর চেষ্টা করল। এক পর্যায়ে তিনি বলে উঠলেন, যত পারেন লিখেন কিছু আসে যায় না। আমি প্রশাসনের ধার ধারিনা। আমি লেদুর মেয়ে। লেদু আঙ্কেল এর নাম শুনলে প্রশাসন কিছু করতে পারবে না। এক পর্যায়ে প্রতিবেদকরা তাকে থামিয়ে এবং চেয়ারে বসিয়ে ১ সেপ্টেম্বর মিসেস নাজু(৩০) দেয়া ব্যবস্থাপত্রের কপি দেখালে ব্যবস্থাপত্রটি তার বলে স্বীকার করেন। ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখিত এবং তার চেম্বারে প্রবেশ মুখে নামের সাথে ডিগ্রী সমূহ নিয়ে জানতে চাইলে সার্টিফিকেট বাসায় রয়েছে বলে এড়িয়ে যান।
পরবর্তীতে প্রতিবেদক তার প্রেসক্রিপশন প্যাড দেখতে চাইলে তিনি আর কোন প্রেসক্রিপশন প্যাড নেই বলে জানান এবং সাদা প্যাডে রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দেন বলে জানান। উক্ত ভুয়া চিকিৎসক জাহাঙ্গীর আলম কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে তিনি আবার সাংবাদিক বলে পরিচয় দিয়ে ভুয়া একটি আইডি কার্ড দেখান। প্রতিবেদক তিনি সাংবাদিক না চিকিৎসক জানতে চাইলে কোন উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান।
উক্ত ভুয়া চিকিৎসক জাহাঙ্গীর আলমের বিষয়ে টেলিফোনে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডাক্তার আজিজুর রহমান সিদ্দিকী জানান, ২০১০ এর স্বাস্থ্য নীতিমালা অনুসারে বিএমডিসি অনুমোদিত এমবিবিএস ও বিডিএস ডিগ্রী ধারী ছাড়া নামের পূর্বে ডাক্তার লেখা আইনত দন্ডনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এছাড়াও জাহাঙ্গীর আলমের নামের সাথে লাগানো ডি.ডি.এস(ডেন্টাল),ডি.টি(২),ডে ন্টাল সার্জন বিষয়ে টেলিফোনে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন বলেন, জাহাঙ্গীর আলম নামের সাথে যে ডিগ্রীগুলো যুক্ত করেছেন বাংলাদেশ ওই ডিগ্রী গুলোর কোন অস্তিত্ব নেই এবং ডেন্টাল সার্জন লিখার তার কোন এখতিয়ার নেই। সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেনের সাথে কথা বলে অচিরেই জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান।
এদিকে ভুয়া চিকিৎসকের বিষয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোঃ ইলিয়াস হোসেনের সাথে টেলিফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ সময় মোবাইল ফোনে বায়েজিদ থানার অফিসার ইনচার্জ এর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে মোবাইল ফোনে সংযোগ না পাওয়ায় কোন মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে ভুয়া চিকিৎসক জাহাঙ্গীর আলম এর বিষয়ে চট্টগ্রাম প্রাথমিক দন্ত চিকিৎসক কল্যাণ সমবায় সমিতি লিঃ ও বৃহত্তর চট্টগ্রাম ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অভিজিৎ দে রিপন বলেন, আমরা ডিপ্লোমা দন্ত চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও নামের আগে ডাক্তার লিখিনা, আমরা শুধুমাত্র প্রাথমিক দন্ত চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকে। ২০১০ সালের স্বাস্থ্য নীতিমালা অনুসারে বিএমডিসি অনুমোদিত এমবিবিএস ও বিডিএস ডিগ্রী ধারী ছাড়া অন্য কেউ নামের পূর্বে ডাক্তার লিখলে এবং নামের পরে ডেন্টাল সার্জন লিখলে তা আইনত দন্ডনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমি যারা আইনের তোয়াক্কা না করে ও নীতিমালা অনুসরণ না করে নামের পূর্বে ডাক্তার লিখে চিকিৎসাসেবা চালাচ্ছে এ বিষয়ে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করি। এছাড়াও অনুসন্ধানে জানা যায়, উক্ত ভুয়া চিকিৎসকের আলিশান চেম্বারে একজন বৈধ চিকিৎসক ও চেম্বার করেন।
উক্ত চিকিৎসকের নাম ডাক্তার ইফতেখারুল ইসলাম (বিডিএস)। ভুয়া চিকিৎসক জাহাঙ্গীর আলম এর বিষয়ে টেলিফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি সপ্তাহে একদিন তার চেম্বারে আমার রোগী গুলোকে ব্যবস্থাপত্র দিই, তবে জাহাঙ্গীর আলম এর বিষয়ে আমি কিছুই জানি না এটা তারই একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। প্রতিবেদক ভুয়া চিকিৎসক জাহাঙ্গীর আলম এর বিষয়ে টেলিফোনে জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন, ২০১০ সালের স্বাস্থ্য নীতিমালা অনুসারে জাহাঙ্গীর আলম নামের পূর্বে ডাক্তার এবং ডেন্টাল সার্জন লিখতে পারেন না। এটি চরম অন্যায় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ বিষয়ে ইউএসটিসির মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ডাক্তার প্রভাত চন্দ্র বড়ুয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০১০ সালের স্বাস্থ্য নীতিমালা পরিপন্থী কিছু করলে তা অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পরবর্তীতে ভুয়া ডাক্তার জাহাঙ্গীর আলম এর বিষয়ে সিরিজ আকারে বিস্তারিত প্রতিবেদন আসছে।
এদিকে আজ বিকেলে সরেজমিনে পরিদর্শনে ভুয়া চিকিৎসক জাহাঙ্গীরের চেম্বারে গেলে দেখতে পাওয়া যায় চেম্বারে প্রবেশ পথে গ্লাচে ডা. জাহাঙ্গীর আলম নাম দিয়ে লাগানো ডিজিটাল স্টিকার পাল্টিয়ে ডেন্টিস্ট জাহাঙ্গীর আলম নাম দিয়ে নতুন স্টিকার লাগিয়েছে। অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, তার পূর্ববর্তী প্রেসক্রিপশন প্যাড বদলিয়ে তড়িঘড়ি করে নতুন প্রেসক্রিপশন প্যাড ছাপিয়েছে। জানা যায়, নতুন প্রেসক্রিপশন প্যাডেও ডা. জাহাঙ্গীর আলম নাম না দিয়ে ডেন্টিস্ট জাহাঙ্গীর আলম নাম দিয়ে নতুন প্রেসক্রিপশন প্যাড ছাপিয়ে অপচিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে। এই নিয়ে স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে কৌতুহলের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে অনুসন্ধানে জানা যায়, সিটিজি ক্রাইম নিউজ ও সিটিজি ক্রাইম টিভি উক্ত ভুয়া চিকিৎসক জাহাঙ্গীর আলম এর পক্ষ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে হাসি ঠাট্টার জন্ম দিয়েছে। এ নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অক্সিজেন এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, সিটিজি ক্রাইম নিউজ ও সিটিজি ক্রাইম টিভি ভুয়া চিকিৎসকের পক্ষে সংবাদ পরিবেশন করে সরকারের স্বাস্থ্য নীতিমালা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেছে। তিনি আরো বলেন, সিটিজি ক্রাইম নিউজ ও সিটিজি ক্রাইম টিভি উক্ত সংবাদ পরিবেশন করে সরকারের আইনকে অমান্য করেছে মনে করি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও মহানগর আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেন, সরকারের ২০১০ সালের স্বাস্থ্য নীতিমালা আইন লংঘন করে ও বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল এর অনুমোদন বিহীন কোন ব্যক্তি নামের পূর্বে ডাক্তার লিখলে তা আইন লঙ্ঘনের শামিল ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে মনে করি। জাহাঙ্গীর আলম নামের পূর্বে ডাক্তার লিখে দীর্ঘ সাত বছর যাবত যে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়েছে তা অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রশাসনকে জরুরী ভিত্তিতে জাহাঙ্গীর আলম কে আইনের আওতায় আনা উচিত মনে করি।
এদিকে সিটিজি ক্রাইম নিউজ ও সিটিজি ক্রাইম টিভি ভুয়া ডাক্তার এর পক্ষ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করার বিষয়ে জানতে চাইলে ইফতেখার সাইমুল বলেন, কোন ব্যক্তি ডাক্তার নয় কিন্তু তাকে ডাক্তার বলে উদ্দেশ্য করে সংবাদ পরিবেশন করা চরম আইন লঙ্ঘনের শামিল ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তিনি আরো বলেন, জাহাঙ্গীর আলম নামের পূর্বে ডাক্তার লিখে যে অপরাধ করেছে সিটিজি ক্রাইম নিউজ ও সিটিজি ক্রাইম টিভি ডাক্তার এর পক্ষ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে সমান অপরাধে অপরাধী বলে মনে করি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগের উপ-পরিচালক ডাক্তার শফিকুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০১০ সালের স্বাস্থ্য নীতিমালা অনুসারে বি এম ডি সি এর অনুমোদন ব্যতীত (এমবিবিএস) ও (বিডিএস) ডিগ্রী ধারী ছাড়া কেউ নামের পূর্বে ডাক্তার লিখে চেম্বার করতে পারবে না, কেউ যদি এই স্বাস্থ্য নীতিমালার পরিপন্থী কোন কাজ করে তাহলে তা আইনত দন্ডনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ বিষয়ে পাঁচলাইশ ৩ নং ওয়ার্ড এর স্থানীয় কাউন্সিলর কফিল উদ্দিন খাঁন এর কাছে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভুয়া চিকিৎসক জাহাঙ্গীর আলম আমার ওয়ার্ডে দীর্ঘ ৭ বছর চেম্বার করলেও এ বিষয়ে আমি অবগত ছিলাম না। আপনাদের মাধ্যমে আজ জানতে পারলাম এবং শুনে হতবাক হলাম। আমি একজন কাউন্সিলর হিসেবে মনে করি, সরকারের কোন আইন যে কেউ অমান্য করলে তা আইনত দন্ডনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ বিষয়ে আজ দুপুরে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক খোরশেদ আলম এর কাছে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি একজন আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে বিষয়টি শুনে হতবাক হয়েছি। অক্সিজেন মোড় এর মত একটি জনবহুল জায়গায় কিভাবে একজন ভুয়া চিকিৎসক তার চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তা প্রশ্নের সম্মুখীন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলকে সচেতন হওয়া জরুরী বলে মনে করি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও তরুণ সমাজ কর্মী রুবেল বড়ুয়ার কাছে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দিন দিন ভূয়া ডাক্তারের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের যথাযথ আইন প্রয়োগ না থাকায় জাহাঙ্গীর আলমের মত ভুয়া চিকিৎসকের কাছে মানুষ প্রতারিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ডেন্টাল ইউনিটের সহকারী অধ্যাপক ডাক্তার খতিজা বেগমের কাছে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে যাদের তদারকি নজরদারি ও দায়িত্ব পালন করার কথা তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে এসব চিকিৎসকরা ভুয়া চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে। আমি মনে করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে আরো জোরালো তৎপর হওয়া প্রয়োজন।
পরবর্তীতে ভুয়া ডাক্তার জাহাঙ্গীর আলম এর বিষয়ে সিরিজ আকারে বিস্তারিত প্রতিবেদন আসছে…
সিরিজ ১ : প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দেদারছে চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যাচ্ছে ভুয়া চিকিৎসক জাহাঙ্গীর আলম।
সিরিজ ২: ভুয়া চিকিৎসক জাহাঙ্গীর

