![]() |
| রাসুল (সা.)-এর দৈহিক গঠন কেমন ছিল |
হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
প্রিয় নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, চরিত্র ও আদর্শ মুসলমানদের জন্য সর্বোত্তম অনুসরণীয়। তাঁর পবিত্র জীবন সম্পর্কে বিভিন্ন হাদিস ও সিরাতগ্রন্থে যেমন বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে, তেমনি তাঁর দৈহিক গঠন ও অবয়ব সম্পর্কেও সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর বর্ণনা পাওয়া যায়।
এসব বর্ণনায় রাসুল (সা.)-এর চেহারা, চুল, চোখ, নাক, দাঁত, দাড়ি, হাত-পা, শরীরের গঠন ও চলাফেরাসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের কথা উঠে এসেছে। হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকীর সংকলিত বর্ণনা অনুসারে তাঁর দৈহিক বৈশিষ্ট্যগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।
চেহারা মোবারক:
রাসুল (সা.)-এর চেহারা ছিল অত্যন্ত লাবণ্যময় ও নূরানি। বর্ণনায় তাঁর মুখমণ্ডলের উজ্জ্বলতাকে পূর্ণিমার চাঁদের সৌন্দর্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তাঁর গায়ের রং ছিল কোমল ও উজ্জ্বল।
দৈহিক আকৃতি:
তিনি খুব লম্বাও ছিলেন না, আবার খাটোও ছিলেন না। তাঁর দৈহিক গঠন ছিল মধ্যম ও ভারসাম্যপূর্ণ। বর্ণনাকারীদের মতে, সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বে তিনি ছিলেন অনন্য।
চুল:
রাসুল (সা.)-এর চুল ছিল কিছুটা ঢেউ খেলানো ও কোঁকড়ানো। কখনো তা কানের লতি পর্যন্ত, আবার কখনো ঘাড় পর্যন্ত দেখা যেত। বয়সের শেষ দিকে তাঁর চুলে লালচে আভা দেখা দিয়েছিল বলে বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
মাথা ও চোখ:
তাঁর মাথা ছিল তুলনামূলক বড়। চোখের মণি ছিল গভীর কালো এবং চোখের পাতা ছিল দীর্ঘ। তাঁর চোখের সৌন্দর্য ও অভিব্যক্তি ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
নাক:
রাসুল (সা.)-এর নাক ছিল সুঠাম, সুন্দর ও উঁচু। তাঁর মুখমণ্ডলের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
দাঁত:
তাঁর দাঁত ছিল অত্যন্ত সুন্দর ও উজ্জ্বল। দাঁতগুলোর মধ্যে সামান্য ফাঁক ছিল। তিনি হাসলে দাঁতের শুভ্রতা মুক্তার মতো ঝলমল করত বলে বর্ণনায় এসেছে।
ঘাড় ও কাঁধ:
রাসুল (সা.)-এর ঘাড় ছিল দীর্ঘ ও সুগঠিত। তাঁর কাঁধ ছিল প্রশস্ত এবং কাঁধের হাড় ছিল দৃঢ় ও সুঠাম।
মোহরে নবুয়াত:
দুই কাঁধের মাঝামাঝি স্থানে একটি উঁচু মাংসল অংশ ছিল, যা মোহরে নবুয়াত নামে পরিচিত। বিভিন্ন বর্ণনায় এর আকৃতি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায়। এটি রাসুল (সা.)-এর নবুয়তের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে।
দাড়ি:
রাসুল (সা.)-এর দাড়ি ছিল ঘন ও দীর্ঘ। বিভিন্ন বর্ণনায় তাঁর দাড়ির সৌন্দর্য ও পরিপাটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
হাত ও আঙুল:
তাঁর হাত ও আঙুল ছিল দীর্ঘ ও সুগঠিত। হাতের তালু ছিল প্রশস্ত ও ভরাট। তাঁর হাতের কোমলতা ও সৌন্দর্য সম্পর্কেও বর্ণনা পাওয়া যায়।
বক্ষ:
রাসুল (সা.)-এর বক্ষ ছিল প্রশস্ত ও সুগঠিত। বক্ষ থেকে নাভি পর্যন্ত সরু একটি লোমরেখা ছিল বলে বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
পেট:
তাঁর পেট ছিল সমতল ও সুগঠিত। শরীরে অতিরিক্ত মেদ বা স্থূলতার কোনো লক্ষণ ছিল না।
পা ও পদযুগল:
রাসুল (সা.)-এর উরু ও পা ছিল সুগঠিত। তাঁর গোড়ালি ছিল তুলনামূলক সরু এবং পায়ের গঠন ছিল দৃঢ় ও সুন্দর। চলার সময় তিনি বিনয় ও সংযমের সঙ্গে হাঁটতেন এবং সাধারণত দৃষ্টিকে নিচের দিকে রাখতেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
ত্বক ও ঘ্রাণ:
রাসুল (সা.)-এর ত্বক ছিল অত্যন্ত কোমল ও মসৃণ। তাঁর শরীর থেকে নির্গত ঘামের সুগন্ধের কথাও সাহাবিদের বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়। তাঁর ঘামকে সুগন্ধি ও মনোরম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
সামগ্রিক দৈহিক বৈশিষ্ট্য:
রাসুল (সা.)-এর দেহ ছিল না অতিরিক্ত স্থূল, না অতিরিক্ত ক্ষীণ। তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল সৌন্দর্য, গাম্ভীর্য, দৃঢ়তা ও কোমলতার অপূর্ব সমন্বয়। তাঁর চেহারা ও উপস্থিতি মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলত বলে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর বর্ণনায় জানা যায়।
রাসুল (সা.)-এর দৈহিক বৈশিষ্ট্যের এসব বর্ণনা মূলত তাঁর সাহাবিদের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ ও পরবর্তী সিরাত-সাহিত্যে সংরক্ষিত বিবরণের ওপর ভিত্তি করে এসেছে। তাই এসব বর্ণনা পাঠের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট হাদিস ও প্রামাণ্য সিরাতগ্রন্থের মূল বক্তব্যও বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: সিরাতে ইবনে হিশাম, পৃ. ৪৯; বিশ্বনবী পরিচয়, পৃ. ৭৮।

