আজিজুল ইসলাম সজীব,হবিগঞ্জ হবিগঞ্জের জেলার মাধবপুরের আলোচিত গৃহবধুকে (ফেরদৌসী) ২ সন্তানসহ আত্মহত্যা করার জন্য প্ররোচনার দেওয়ার মামলায় উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ ২৭ জন আসামীকে বেকসুর খালাস প্রদান করেছে আদালত।
সোমবার সাড়ে ৩ টার দিকে এ রায় দেন নারী ও শিশু নিযার্তন ট্রাইবুনালের বিচারক মোহাম্মদ হালিম উল্ল্যা। গত ২০১১ সালে ১৪ আগস্ট রাতে ৪ সন্তানকে নিয়ে মা ফেরদৌসী সিলেটগামী ট্রেন সুরমা মেইলের নিচে আত্মহত্যার জন্য ঝাঁপ দেয়। এতে ২ সন্তানসহ ফেরদৌসী মারা যান।
পরে এঘটনায়, ১৬ আগস্ট ফেরদৌসীকে আত্মহত্যায় প্ররোচণার অভিযোগে মাধবপুরর থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (এস আই) মোঃ ইয়াছিনুল হক বাদী হয়ে অজ্ঞাত লোকজনদের আসামী করে মামলা দায়ের করেন। (মামলা নং-৪৮৫/১১)।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহজাহান ভূইয়া প্রায় ২ মাস মামলাটি তদন্ত করে আন্দিউড়া ইউপি চেয়ারম্যান ও মাধবপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী আতিকুর রহমান আতিক, গ্রামের মোড়ল তপন চন্দ্র দেব, মলাই মিয়া, আব্দুর রহমান চৌধুরী, ফজলুর রহমান, হাজী মহব্বত খা, করিম খা, ফুরুক মিয়া, রঙ্গু মিয়া, মোহাম্মদ আলী, আবু তাহের, রহিম, সুমন চৌধুরী, ফরিদ চৌধুরী এসব নাম আসামী উল্লেখ করে ১৪ অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
মামলার সূত্রে জানা যায়, মাধবপুর উপজেলার সুলতানপুর গ্রামের দুবাই প্রবাসী জিলন মিয়া এর স্ত্রী ফেরদৌসী বেগম (৩৫) এর সাথে পাশের বাড়ির আব্দুল কাদির নামে জনৈক যুবকের পরকিয়া প্রেমের সম্পর্ক এবং স্বামী না থাকার কারনে পরক্রিয়া প্রেমিকের সাথে অনৈতিক শারীরিক সম্পর্ক আছে বলে মিথ্যা অভিযোগ তুলেন প্রবাসী স্বামী জিলনের ভাই ও ভাবীরা। এবং এলাকা জুড়ে এ বিষয়টিকে নিয়ে রসালো সমালোচনার মুখে পড়তে। এদিকে বিষয়টি ফেরদৌসির বাবার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার সেজামুরা গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। অনেকের ধারণা, ফেরদৌসি লোকলজ্জার ভয়ে তার সন্তানাদি নিয়ে আত্মহত্যার করার সিদ্ধান্ত নেন।
উল্লেখ, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২০১১ সালের ১৪ আগস্ট ঐগ্রামের গ্রাম্য মাতব্বরা মহব্বত হাজীর বাড়িতে এক সালিশ বৈঠকে আয়োজন করেন।সালিশে স্থানীয় আন্দিউড়া ইউপি চেয়ারম্যান আতিকুর রহমানের উপস্থিতিতে সালিশ বৈঠকে বসেন সাবেক মেম্বার মলাই মিয়া, আব্দুল রহমানসহ গ্রামের অন্যান্য মোড়লরা উপস্থিত ছিলেন। উক্ত সালিশে ফেরদৌসী ও কাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করে কান ধরে উঠবস করানো এবং ৫ জন মৌলভী ডেকে তওবা করার নির্দেশ দেয়া হয়। কাদির এ নির্দেশ পালন করলেও ফেরদৌসী তা করেন নি। ফলে মাতব্বররা তাকে সামজচ্যুত করার ঘোষণা দেন।
পরে ঐরাতেই মানসম্মান ও লোক সমাজের অকথ্য ভাষার সমালোচনা না সহ্য করতে পেরে রাত প্রায় ৩টার দিকে নিজ ঘর থেকে ৪ সন্তানসহ তার বাবার বাড়ি সেজামুড়া যাওয়ার কথা বলে শাহপুর ষ্টেশনে আসে। এ সময় চট্টগ্রাম থেকে সিলেটগামী সুরমা মেইলের নিচে ৪ সন্তানসহ আত্মহত্যার জন্য ঝাঁপ দেয় ফেরদৌসী। এতে ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান ফেরদৌসী ও তার মেয়ে বন্যা। হাসপাতালে নেয়ার সময় মারা যায় তার ছেলে শাওন। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় তার ছেলে কুদ্দুস রহমান জীবন ও মেয়ে ঝর্ণা তবে ২ জনই গুরুতর আহত হয়। তাদের ভর্তি করা হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি বেসরকারী হাসপাতালে। ঘটনাটি জানার পরই জিলন মিয়া দুবাই থেকে দেশে চলে আসেন। জিলন মিয়া দেশে আসার পর ফেরদৌসী ও ২ সন্তানের দাফন সম্পন্ন করা হয়। আহত ২ সন্তানকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রেখেই কর্মস্থল দুবাইয়ে ফিরে যান জিলন মিয়া। অর্থাভাবে ২ শিশুর চিকিৎসা হচ্ছে না।
এখব শুনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন হবিগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মাহমুদ হাসানসহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ। আসেন ছুটে আসেন রাজউক এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ দৌলার নেতৃত্বে মানব কল্যাণ সমিতির কর্মকর্তারা। তারা অসুস্থ শিশু দু’টির পাশে দাঁড়ায়। প্রায় ১ মাস চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে উঠে তারা।এর পর থেকে তাদের ঠিকানা হয়, নানার বাড়ী সেজামুড়া গ্রামে। ফেরদৌসীর মৃত্যুর ৬ মাস পর তার স্বামী জিলন দুবাই থেকে দেশে ফিরে এসে সুলতানপুর গ্রামের হুসেন আলীর মেয়ে হালেমা খাতুনকে বিয়ে করে বাধে নতুন সংসার। কিছুদিন পর জিলন আবারও চলে যায় কর্মক্ষেত্র দুবাইয়ে।হবিগঞ্জের নারী শিশু আদালতের বিশেষ পিপি আবুল হাশেম মোল্ল্যা মাসুম বলেন- মামলার সাক্ষীরা ঠিকমত সাক্ষ্য প্রদান না করায় আসামীরা আজ বেকসুর খালাস পেয়ে গেছে।

