সময় সংবাদ ডেস্কঃ
পাবনার বেড়া উপজেলার কাজীরহাট ফেরিঘাটের পারাপারের অপেক্ষায় থাকা কোরবানি পশু এবং পণ্যবাহী যানবাহনের জট কমেনি। বরং তাদের দুর্ভোগ বেড়ে চলেছে বলে ভুক্তভোগী চালক ও ব্যবসায়ীরা জানান। কোরবানির পশুকে দ্রুত পার করার জন্য অনেক গরু ব্যাপারি নগরবাড়ী ঘাট হয়ে অবৈধভাবে নৌকায় পার হচ্ছেন। এতে থাকছে নৌকাডুবি ও প্রাণহানির আশংকা।
সোমবার সকালে কাজীরহাট ঘাটে গিয়ে দেখা যায় বাধের হাট থেকে কাজীরহাট ঘাট পর্যন্ত প্রায় ৪কি.মি এলাকাজুড়ে ৪শ' ট্রাকের সারি। এসব ট্রাকে রয়েছে নানা রকম পণ্য ও কোরবানির পশু। পশুবাহী ট্রাকগুলো দ্রুত ফেরিতে ওঠানোর জন্য সিরিয়াল দেওয়া হচ্ছে। এতে আটকা পড়ে আছেন পণ্যবাহী ট্রাকের চালক-ব্যবসায়ীরা। তীব্র যানজটের কথা জেনে অনেক গরু ব্যবসায়ি কাজীরহাট থেকে কয়েক কি.মি দূরের নগরবাড়ী ঘাট হয়ে নৌকায় গরু পারাপার করছেন।
স্থানীয়রা জানান, নৌকায় গরু পারাপার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে প্রতি বছরই দুর্ঘটনা ঘটে। গত বছরও কোরবানি ঈদের আগে ২৪ জুলাই গরু বোঝাই ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে। সেই দিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে যেয়ে এখনো ভয়ে শিউরে ওঠেন পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার আর আতাইকুলার কুমিরগাড়ী গ্রামের বাসিন্দারা।
রজব আলী নামের এক ভুক্তভোগী জানান, ট্রলারের মাঝির লোভই তাদের সর্বনাশ করেছিল। ঈদের আগে ঈদ আনন্দর বদলে দুঃখ আর দেনার বোঝা নিয়ে অন্তত ২০ জন ব্যাপারি বাড়ি ফিরেছিলেন।
তিনি আরো জানান, গত বছর ২৪ জুলাই ভোরে তারা নছিমনে গরু বোঝাই করে নগরবাড়ী ঘাটে যমুনা পাড়ে হাজির হন। সকাল আটটার দিকে তিনিসহ অন্যান্য গরু ব্যাপারি ও ব্যাপারিদের সহযোগিতায় নৌকায় ওঠেন। সংখ্যায় তারা ছিলেন মোট ৪০ জন। এর মধ্যে ব্যাপারি ছিলেন প্রায় ২০ জন।
ট্রলার বোঝাই হওয়ার পরও মাঝি গরু তুলতে থাকায় তিনিসহ কেউ কেউ প্রতিবাদ জানান। তবে এ সময় মাঝি বলেন, কিছু হবে না। আবার কয়েকজন উদাসীন ব্যাপারি ট্রলার যে বেশি বোঝাই হচ্ছে এটাকে গুরুত্বই দেননি। মাঝামাঝি গিয়ে পদ্মা- যমুনার সংযোগস্থলে নদীর ভয়াবহ রূপ দেখে মাঝি ট্রলার ঘুরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তা আর সফল হয়নি। স্রোতের পাঁকে পড়ে মুহূর্তে ট্রলার ডুবে যায়। সবাই নিজের প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে যান। কেউ গরুর লেজ ধরেন, কেউ নৌকার চরাট(কাঠখন্ড) ধরে ভাসতে থাকেন।
এদিকে কাজীরহাট ঘাটে পারাপারের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকা ট্রাক চালকরা জানান, তাদের সীমাহীন দুর্ভোগের কথা। তারা জানান, বঙ্গবন্ধু সেতুতে যানজট। তাই তারা কাজীরহাট ঘাট হয়ে রাজধানীতে যেতে চেয়েছেন। কিন্তু এখানে এসেও সেই যানজটের কবলেই পড়েছেন। তারা জানান, কাজীর হাট ঘাটে থাকা বা খাওয়ার সমস্যা তো রয়েছেই। এর উপর রাতের বৃষ্টিতে তারা বেকায়দার পড়েছেন। ট্রাকে থাকা মালামাল নষ্ট হবার আশংকায় রয়েছে।
ট্রাকচালক মগরেব আলী জানান, তিনি সোনা মসজিদ থেকে ৩ দিন আগে এসেও ঘাটে পড়ে আছেন। তার ট্রাকে ধানের কুড়া আছে বলে জানান।
তিনি আরো জানান, সোনা মসজিদ থেকে ভুট্টা নিয়ে এসেছেন শুকুর ড্রাইভার, উজ্জ্বল ড্রাইভার নিয়ে যাচ্ছেন ভুট্টা, এনামুল ড্রাইভার নিয়ে যাচ্ছেন গম। তাদের মত অসংখ্য ড্রাইভার পণ্য বোঝাই ট্রাক নিয়ে ঘাটে ৩-৪ দিন ধরে পড়ে আছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
তারা ঘাটে পারাপারে অনিয়মের অভিযোগ করেন। তারা বলেন, গরু বোঝাই ট্রাকগুলো আগে যাচ্ছে। সেগুলোর সঙ্গে কিছু প্রাইভেটকার ও মাইক্রোও যেতে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তাদের সিরিয়াল দেয়া হচ্ছে না।
ট্রাকচালক মো: বাবলু জানান, বলেন, তিনি ঠাকুরগাঁ থেকে ভুট্টা নিয়ে যাচ্ছেন। দু’দিন ধরে সিরিয়ালে পড়ে আছেন। ঘাট পারাপারে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি জানান, কাঁচা মালামাল পার হচ্ছে, গরুর গাড়ি পার হচ্ছে। এর সাথে প্রাইভেট কার, মাইক্রো পাড় হচ্ছে কিন্তু তাদের সিরিয়াল দেয়া হচ্ছে না।
সাভারের ট্রাকচালক রুবেল হোসেন জানান, ঈদের আর ৩ দিন। তাদের এবার ঈদ রাস্তাতেই করতে হবে। তিনি জানান, আমিনপুর থানার ওসি তাদের মালবাহী ট্রাক ফেরির প্রতিটি ট্রিপে কয়েকটি দেয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ঘাট কর্তৃপক্ষ কেউ কোনো কথাও শুনছেন না। তার সঙ্গে আরো কয়েক চালক জানালেন তারা গত চারদিন আটকা পড়ে আছেন।
বিআইডব্লিউটিসি’র কাজীরহাট ঘাট এর ম্যানেজার মাহবুবুর রহমান যানজটের কারণ হিসেবে কোরবানির পশুবাহী ট্রাক বেশি যাওয়ার কথা জানান।
তিনি জানান, কাজীরহাট ঘাটে প্রায় ৪-৫শ’ ট্রাকের জট সৃষ্টি হয়েছে। ফেরির ট্রিপ সংখ্যা বাড়লে যানজট কমে যাবে। তাছাড়া আরিচা-কাজীরহাট রুটে এখন ৩টি ফেরি চলাচল করছে। একটি ফেরি নষ্ট হওয়ায় গত এক মাস ধরে সেটি চলছে না। বিআইডবিøউটিসি কাজীরহাট ঘাট ইনচার্জ খালেদ মোশারফ জানান, ফেরি দ্রুতই লোড- আনলোড হচ্ছে। তারপরও যানজট থেকে যাচ্ছে।
আমিনপুর থানার ওসি রওশন আলী জানান, তিনিসহ থানা পুলিশের দুটি টিম ঘাট এলাকায় অবস্থান করছেন। তারা শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করছেন। অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা রোধে কোন স্পীডবোট যেতে দেয়া হচ্ছে না। তাদের সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনের জন্য কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
বিআইডব্লিউটিএ’র উপ-সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল আওয়াল জানান, ঘাটে ফেরির সংখ্যা বেশি থাকলে এ রকম যানজট থাকত না। তবে অতিরিক্ত ফেরির বিষয়ে তিনি জানান, সেটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ব্যাপার।
এদিকে শুক্রবার দুপুরে কাজীরহাট ঘাট পরিদর্শনে এসে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরি এমপি বলেছেন, শীঘ্রই আরিচা-কাজীরহাট রুটে আরেকটি রো-রো ফেরি দেয়া হবে।
এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিএর ডিজিএম জিল্লুর রহমান জানান, জানান, লকডাউন শিথিল এবং ঈদকে সামনে রেখে রাজধানী ছেড়ে আসা মানুষের চাপ বেড়েছে কাজীরহাটসহ সব ফেরিঘাটে। বিশেষ করে কাজীরহাট ঘাটে চাপ রয়েছে রাজধানীমুখি কোরবানির পশুবাহী ট্রাক চলাচলে। তারা আশা করছেন দ্রুতæতই এ রুটে আরেকটি ফেরি সংযুক্ত হতে পারে। তবে ঠিক কবে আসবে তা তিনি বলতে পারেননি।

