নিরাপত্তা-শঙ্কায় বন্ধ ১২৫ বছরের ঐতিহ্যবাহী তেলজুড়ী নৌকাবাইচ - সময় সংবাদ | Popular Bangla News Portal

Breaking

Post Top Ad

Responsive Ads Here

সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬

নিরাপত্তা-শঙ্কায় বন্ধ ১২৫ বছরের ঐতিহ্যবাহী তেলজুড়ী নৌকাবাইচ

 

নিরাপত্তা-শঙ্কায় বন্ধ ১২৫ বছরের ঐতিহ্যবাহী তেলজুড়ী নৌকাবাইচ
নিরাপত্তা-শঙ্কায় বন্ধ ১২৫ বছরের ঐতিহ্যবাহী তেলজুড়ী নৌকাবাইচ


আব্দুল্লাহ আল মামুন রনী, বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি:

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার শেখর ইউনিয়নের তেলজুড়ী বাজারসংলগ্ন কুমার নদে দীর্ঘ ১২৫ বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসা ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলা এবার বন্ধ রাখা হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ, সাম্প্রতিক সংঘর্ষ এবং নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


‘তেলজুড়ী নৌকাবাইচের মেলা’ নামে পরিচিত এ আয়োজন স্থানীয় লোকসংস্কৃতি ও বিনোদনের অন্যতম বড় উৎসব হিসেবে পরিচিত। প্রতিবছর নৌকাবাইচকে ঘিরে নদীর দুই পাড়ে বসে জমজমাট মেলা। তবে এবার আয়োজন না হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও মেলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।


স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তেলজুড়ী বাজারসংলগ্ন কুমার নদে শত বছরেরও বেশি সময় ধরে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। স্থানীয় রীতি অনুযায়ী বাজার বণিক সমিতি ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিবছর মেলা পরিচালনার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়।


সর্বশেষ কমিটিতে সভাপতি করা হয় বিএনপি নেতা শাকির আহমেদ শাকু ফকিরকে এবং সাধারণ সম্পাদক করা হয় সাবেক ইউপি সদস্য মো. রহমান মেম্বারকে।


সম্প্রতি মেলা আয়োজনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কমিটির মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। একপর্যায়ে সভাপতি শাকির আহমেদ শাকু ফকির পদত্যাগ করলে কমিটিতে অচলাবস্থা তৈরি হয়। এরপর চলতি বছর মেলা ও নৌকাবাইচ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।


মেলা কমিটির সাবেক সভাপতি শাকির আহমেদ শাকু ফকিরের দাবি, পার্শ্ববর্তী সালথা উপজেলার কয়েকটি গ্রামে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের কারণে মেলা আয়োজন নিয়ে নিরাপত্তা-শঙ্কা তৈরি হয়েছে।


তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দুই উপজেলার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সহযোগিতা ছাড়া বড় পরিসরে মেলা আয়োজন করা কঠিন। গত জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের একটি পক্ষ মেলা আয়োজনে বাধা দিচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।


শাকির আহমেদ শাকু ফকির বলেন, বড় ধরনের সংঘাত এড়াতেই তিনি কমিটির সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, তিনি অন্যদের দায়িত্ব নিয়ে মেলা আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছিলেন। পরে তিনি জানতে পারেন, চলতি বছর মেলা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।


তবে রাজনৈতিক বিরোধের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. রহমান মেম্বার। তাঁর দাবি, মূলত নিরাপত্তাজনিত কারণেই এবার মেলা আয়োজন করা হয়নি।


তিনি বলেন, গত বছর মেলা-পরবর্তী সময়ে সালথা উপজেলার খারদিয়া গ্রামের লোকজনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। এবারও মেলার কয়েক দিন আগে ময়েনদিয়া, জয়পাশা, ধুলজুড়া ও পরমেশ্বরদীর লোকজনের সঙ্গে খারদিয়া গ্রামের লোকজনের কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়েছে। এসব ঘটনায় বহু মানুষ আহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে।


রহমান মেম্বারের ভাষ্য, এমন পরিস্থিতিতে মেলা আয়োজন করা হলে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা ছিল। এর পাশাপাশি মেলা আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও স্পনসর না পাওয়ায় এবার আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।


মেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত জানিয়েছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। তাঁদের দাবি, নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনা হলেও মেলা বন্ধ হওয়ার পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধেরও প্রভাব রয়েছে।


তাঁদের অভিযোগ, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত কয়েকজন নেতার ইন্ধনে তাঁদের কিছু সমর্থক ঐতিহ্যবাহী এ মেলা বন্ধে তৎপর ছিলেন। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা স্থানীয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।


স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা বিরোধের কারণে ১২৫ বছরের ঐতিহ্যবাহী একটি আয়োজন বন্ধ হওয়া উচিত নয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নৌকাবাইচ ও মেলা পুনরায় আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।


দীর্ঘদিন ধরে মেলার সঙ্গে ব্যবসায়িকভাবে যুক্ত মিষ্টির দোকানি আ. জব্বার মোল্যা বলেন, তাঁদের পরিবার প্রায় এক শতাব্দী ধরে এ মেলায় মিষ্টি বিক্রি করে আসছে।


তিনি জানান, তাঁর দাদা ও বাবা এ মেলায় ব্যবসা করেছেন। তিনিও প্রায় ৫০ বছর ধরে আমিত্তি, গজা, দানাদার ও জিলাপি বিক্রি করে আসছেন। এবার মেলা হবে ধরে নিয়ে তিনি প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ময়দা, চিনি ও বেসন কিনেছেন। ইতোমধ্যে কয়েক মণ মিষ্টিও তৈরি করা হয়েছে।


মেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর প্রায় দুই লাখ টাকা ক্ষতি হতে পারে বলে দাবি করেন তিনি।


এমন ক্ষতির কথা জানিয়েছেন মেলার সঙ্গে যুক্ত আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাঁদের ভাষ্য, সারা বছর তাঁরা এ মেলার অপেক্ষায় থাকেন এবং মেলাকে কেন্দ্র করে উল্লেখযোগ্য ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়।


শেখর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ বলেন, মেলা বন্ধের বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি। মেলা কমিটি সহযোগিতা চাইলে তিনি প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করবেন।


বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রকিবুল হাসান বলেন, কয়েকদিন আগে মেলা কমিটির সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। তখন তাঁরা মেলা আয়োজনের কথা জানিয়েছিলেন। মেলা বন্ধের বিষয়ে তাঁকে কেউ অবহিত করেনি।


তিনি বলেন, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঐতিহ্যবাহী এ মেলা আয়োজনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে। শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা দেওয়ার কথাও জানান তিনি।


স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছর মেলাকে কেন্দ্র করে পার্শ্ববর্তী সালথা উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের খারদিয়া গ্রামের কয়েকজনের সঙ্গে বিরোধের সৃষ্টি হয়। পরে জয়পাশা গ্রামে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে জয়পাশার পক্ষ নিয়ে তেলজুড়ীতে হামলার অভিযোগ ওঠে খারদিয়া গ্রামের লোকজনের বিরুদ্ধে।


ওই হামলায় তেলজুড়ী এলাকায় ১৮টি বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের প্রায় ৩০ জন আহত হন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলা সংঘর্ষে তেলজুড়ী ব্রিজসংলগ্ন এলাকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে সেনাবাহিনী, র‍্যাব ও পুলিশের সমন্বিত অভিযানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।


দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এ নৌকাবাইচ ও মেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে এখন মূল আলোচনা—নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কবে আবার ফিরবে তেলজুড়ীর ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজন।


Post Top Ad

Responsive Ads Here