মোঃ মাজহারুল ইসলাম শিপলু, মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধিঃ
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে অবাধে কাঠ পুড়িয়ে তৈরি হচ্ছে কয়লা। উপজেলার পাহাড়ী এলাকা হিসেবে পরিচিত আজগানা ও বাঁশতৈল ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি স্থানে গড়ে উঠেছে প্রায় শতাধিক কয়লা তৈরির বিশেষ ধরনের চুলা। আর এসব করছেন খোদ জনপ্রতিনিধিরাই, আছে স্থানীয় প্রভাবশালীরাও। এতে একদিকে যেমন বনজ সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে, সৃষ্ট ধোয়ায় তৈরি হচ্ছে শ্বাস জনিত নানা ব্যাধির অপরদিকে ঘটছে পরিবেশ বিপর্যয়ও। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িতরা প্রভাবশালী ও জনপ্রতিনিধি হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারছেনা এলাকার ভোক্তভোগী সাধারন জনগণ।
সরেজমিন গিয়ে দেখা গিয়েছে, উপজেলার আজগানা ইউনিয়নের ৩ ওয়ার্ডে মাটি ও ইটের সমন্বয়ে তৈরি করা গোলাকৃতির কয়েক ডজন কয়লা তৈরির কারখানায় গাছ ও কাঠ পুড়িয়ে তৈরি হচ্ছে কয়লা। যার মধ্যে বেশ কয়েকটি চুলার মালিক ৩ নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য রাসেল সিকদার। একই চিত্র পাওয়া গেছে বাশতৈল ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডে গিয়েও। সেখানে থাকা বেশ কয়েকটি চুলার মালিক খোদ ঐ ওয়ার্ডেরই ইউপি সদস্য মোশারফ বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী। অনুসন্ধানে জনপ্রতিনিধি ছাড়াও উঠে এসেছে স্থানীয় প্রভাবশালী অনেকেরই নাম। এছাড়াও ঐ দুই ইউনিয়নের আজগানা, বেলতৈল, হোসেন মার্কেট, তেলিনা, চিতেশ্বরী, গায়রাবেতিল, মাটিয়াখোলা, রহিমপুর, খাটিয়ার হাট ছাড়াও গোড়াই ও তরফপুর ইউনিয়নের কিছু কিছু জায়গায়ও রয়েছে এ ধরনের কারখানা।
ধারনা করা হয়, উপজেলার পাহাড়ী এলাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এমন প্রায় শতাধিক কয়লা কারখানায় প্রতি মাসে কমপক্ষে ৮-১০ হাজার মণ গাছ/কাঠ পুড়িয়ে তৈরি হচ্ছে কয়লা। স্থানীয় ও প¦ার্শবর্তী বাজারে যার প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ৮শ থেকে ১ হাজার টাকা দরে। প্রতিমাসে এই বিশাল পরিমাণের গাছ/গাছের গুড়ি পুড়িয়ে কয়লা বানানোর ফলে খুবই দ্রুতই ঐ এলাকায় অক্সিজেন ঘাটতি সহ নানা প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রোগ বালাই বৃদ্ধির আশংকা করছেন এলাকার সাধারণ ও সচেতন বাসিন্দারা। তারা অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে অবগত হয়েও কোন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না। বনজ সম্পদ রক্ষা, পরিবেশ বিপর্যয় রোধ ও সাধারণ মানুষদের শ্বাস কষ্ট জনিত রোগের হাত থেকে বাঁচাতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে কারখানাগুলো ধ্বংস করে দেওয়ার দাবি জানান অসংখ্য ভোক্তভোগী এলাকাবাসী।
একজন জনপ্রতিনিধি হয়েও কেন এই বনজ সম্পদ ধ্বংস ও পরিবেশ বিপর্যয় করার মত কাজটি তারা করছেন তা জানতে চাওয়া হয়েছিল আজগানা ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রাসেল সিকদারের কাছে। উত্তরে তিনি জানান, সবকিছু ম্যানেজ করে নিয়মিত মাশোয়ারা দিয়েই কাজটি করছেন তারা। বাঁশতৈল ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোশারফের কাছ থেকেও জানার চেষ্টা করা হয়েছিল একই প্রশ্নের উত্তর। উত্তরে তিনি বলেন, ‘‘ শুধু আমি নই, এলাকার অনেকেই এর সাথে জড়িত।
এ বিষয়ে বাঁশতৈল ইউপি চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান মিল্টন বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। বিষয়টি খোজ নিয়ে দেখা হবে।
তবে আজগানা ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রফিকের সাথে যোগাযোগ হলে এক প্রশ্নের জবাবে এই সংবাদদাতাকে বলেন, শুধু রাসেল মেম্বারই এ অবৈধ কাজে লিপ্ত নয়। আজগানা ইউনিয়নে যতো প্রভাবশালীরা রয়েছেন তাদেরও এ অবৈধ চুল্লি রয়েছে, যা থেকে সর্বসাধারণ ভোগান্তিতে রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি সাংবাদিকদের সহায়তায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
কারখানা গুলোর সৃষ্ট ধোয়ায় ঠিক কি ধরনের শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে সে ব্যাপারে ড. বাবুল আক্তার, বিসিএস (স্বাস্থ্য) বলেন, অতিরিক্ত ও দীর্ঘদিন শ্বাসের সাথে ধোঁয়া গ্রহন করলে ফুঁসফুসে ক্যান্সার, এ্যাজমা, সিওপিডি জনিত শ্বাস কষ্ট,ত্বকে প্রদাহজনিত এ্যাকজিমাসহ ও গ্রীষ্মকালীন রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি করে।
এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিচালক মোজাহিদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ হলে তিনি বলেন, বিষয়টি আমাদের জানা নেই। তবে আমাদের কাছে অভিযোগপত্র পৌছে দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ ব্যাপারে মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত সাদমীনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর আগেও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছিল ঐ এলাকাগুলোতে। কিন্তু নতুন করে আবার তারা এ কাজটি করছে তা আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

