জাহাঙ্গীর আলম, টাঙ্গাইল
নদী ভাঙনের ফলে বঙ্গবন্ধুসেতু রক্ষা গাইড বাঁধ ও টাঙ্গাইল শহর রক্ষা বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। বাঁধ দুটি ভেঙে যে কোন সময় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে যাতায়াত সহ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে পারে।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ঘারিন্দা ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের রানাগাছা এলাকায় ঝিনাই নদীতে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে শহর রক্ষা বাঁধ। গত দুইদিনের ভাঙনে কবরস্থান ও বেশ কয়েকটি বসতভিটা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। যেকোন সময় রক্ষা বাঁধ ভেঙে শহরে পানি প্রবেশ করতে পারে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, শুকনো মৌসুমে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করায় বন্যার সময় ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়। ড্রেজারের বিষয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যানসহ প্রশাসনে একাধিকবার অভিযোগ করলেও তারা বিষয়টি কোন আমলে নেননি। ফলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রানাগাছা এলাকাবাসীর।
এদিকে, বঙ্গবন্ধু সেতু রক্ষা গাইড বাঁধ এলাকায় আবারো ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। বুধবার মধ্যরাত থেকে সেতুর পূর্ব পাড় গরিলাবাড়ী অংশে এ ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে ১২ জুলাই বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা পর্যন্ত একশ’ মিটার অংশ ধ্বসে ও ১০টি বসত বাড়ি যমুনার পেটে চলে গেছে। গত বছরের ভাঙনের ফলে দ্বিতীয় সেতু রক্ষা বাঁধটি নদী গর্ভে বিলীন হওয়ায় এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে প্রথম সেতু রক্ষা বাঁধ। ভাঙন অব্যাহত থাকায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বঙ্গবন্ধু সেতু হুমকির মধ্যে রয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে বিবিএ’র পক্ষ থেকে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা কোন কাজেই আসছে না বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছে।
এছাড়া, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ঘারিন্দা ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের রানাগাছা এলাকার রাস্তাটি (শহর রক্ষা বাঁধ) আংশিক ভেঙে গিয়ে হুমকির মুখে রয়েছে। ইতোমধ্যেই তুলা মিয়ার ৪০ শতাংশ, আজাহার আলীর ৪০ শতাংশ, বাদশা মিয়ার ৪০ শতাংশ, সাহাদত আলীর ৩০ শতাংশ, খালেক মিয়ার ৪০ শতাংশ সহ এলাকার বেশ কয়েকজনের জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে রয়েছে শত শত বসতভিটা ও ফসলি জমি।
রানাগাছা এলাকার তুলা মিয়া জানান, গত দুইদিনে ভাঙনে শহর রক্ষা বাঁধটি অর্ধেকের বেশী নদী গর্ভে চলে গেছে। বাঁধের বাকি অংশেও ফাঁটল দেখা দিয়েছে। এই নদী ভাঙন রোধে তিনি প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
সাহাদত আলী জানান, শুকনো মৌসুমে নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমেই তাদের ফসলি জমিসহ বসতভিটা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ড্রেজারের বিষয়টি প্রশাসনকে একাধিকবার জানালেও তারা প্রয়োজনীয় কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
এছাড়া কালিহাতী উপজেলার চরাঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত এলেংজানী নদীতে বর্ষার শুরুতেই ব্যাপক ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। প্রতিনিয়ত ভাঙ্গনের ফলে ৫০ টি বসতবাড়ী নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া শতাধিক বসতবাড়ীর লোকজন পরিবার পরিজন নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে দিন যাপন করছে। যেকোন সময় তাদের বাড়ীঘর খরস্রোতা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। অসহায় শ্রমজীবি এই পরিবারগুলোকে বাঁচাতে সরকারী কোন উদ্যোগ নেই বলেই ভূক্তভোগীরা জানান।
অপরদিকে, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাকুয়া ইউনিয়নের চরপৌলী, রাঙ্গাচুড়া, খাসকাকুয়া এলাকায় যমুনার ভাঙনে অন্তত ৩০টি বসতভিটা নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। গত কয়েকদিনের ভাঙনে দুইটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মসজিদ ও ঐহিত্যবাহী চরপৌলী হাট যমুনার পেটে চলে গেছে। শত শত একর ফসলি জমি ও বসতভিটা হুমকির মুখে রয়েছে। ভাঙন রোধে স্থায়ী একটি বাঁধ নির্মাণের দাবি এলাকাবাসীর।
চরপৌলী এলাকার জেবুন্নেছা জানান, গত তিন বছর ধরে বাড়ি সরিয়ে অন্যের জমিতে ঘর উত্তোলন করে থাকছেন তিনি। এবারেও যমুনার ভাঙন তার ঘরের পেছনে এসেছে। এখন তার আর যাওয়ার কোন জায়গা নেই। তাই তিনি সরকারের কাছে কোন সাহায্য বা সহযোগিতা চান না। তিনি চান রাক্ষুসি যমুনার ভাঙন ঠেকাতে স্থায়ীভাবে একটি বাঁধ নির্মাণ করে তাদের শেষ সম্বলটুকু রক্ষা করা হোক।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক খান মো. নুরুল আমিন জানান, ইতোমধ্যেই ভাঙ্গন কবলিত এলাকাসহ শহর রক্ষা বাঁধ পরিদর্শন করা হয়েছে। ভাঙ্গন ঠেকাতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলেই ভাঙ্গন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

