জসিম উদ্দিন, বেনাপোল থেকে গরিব অসহায় ও দুঃস্থ জনগণের জন্য সরকারের দেওয়া ভিজিএফের চাল বিতরণে প্রতিবারের মতো এবারো ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর পাওয়া গেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে চাল আত্মসাৎ করে কালোবাজারে বিক্রি, পাচারের চেষ্টা, ওজনে কম দেওয়া, ভুয়া কার্ড তৈরি,স্লিপ বিক্রি, প্রকৃত গরিবদের না দিয়ে অন্যদের মধ্যে বিতরণের সহ নানা অভিযোগ উঠেছে জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে।
চাল আত্মসাতের অভিযোগে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আটক এবং ভিজিএফএর চাল বিতরণের কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। এর আগেও দেশের বিভিন্ন জায়গায় গরীবের চাল হরিলুটের ঘটনায় নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ভিজিএফএর চাল দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এবারো ভিজিএফএর চাল নিয়ে চলছে হরিলুটের মহাৎসব। সারা দেশে গরীবের চাল নিয়ে চালবাজির ঘটনা বিভিন্ন প্রত্র-পত্রিকা ও গরীবের চাল হরিলুটের আংশিক কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো যা খুবই বেধনা বিধুর।
যশোরের মনিরামপুর হরিহর নগর ইউনিয়নে ভিজিএফএর চাল নিয়ে লঙ্কাকান্ডের ঘটনা ঘটে। ওজনে চাল কম দেওয়া, প্রকৃত লোককে কার্ড না দেওয়া, চাল আত্মসাৎসহ ঘটে নানা অনিয়ম। এর পরপরই একই উপজেলার হরিদাসকাটি ইউনিয়নের পাঁচবাড়িয়া গ্রামের এক ভ্যান চালকের বাড়ি থেকে ৩৫০ কেজি চাল জব্দ করা হয়। সরকারী বস্তা পরিবর্তন করে এই চাল আত্মসাৎ করে এই ইউনিয়নের কর্মরত কর্মকর্তরা।
ঝিকরগাছা উপজেলার মাগুরা ইউনিয়নের কায়েমকোলা বাজারে ভিজিএফএর কার্ড বিতরণ করা নিয়ে দলীয় প্রতিপক্ষের সাথে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ২জন আওয়ামীলীগ কর্মী মারাত্বক ভাবে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। প্রকৃত লোকজনকে বাদ দিয়ে স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেওয়ার কারনে আওয়ামীলীগের দুই পক্ষের মধ্যে এই সংঘর্ষ বাধে।
বেধনাবিধুর ও লজ্জা জনক ঘটনাটি ঘটে ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ উপজেলার ৫ নং শিমলা রোকপুর ইউনিয়ন পরিষদ চত্ত¡রে। শরিফুল ইসলাম নামে এক ভ্যান চালকের হাতে থাপ্পর খান চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন চৌধুরী। যে ঘটনা ব্যাপক ভাবে ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন গনমাধ্যমে। ভ্যান চালক শরিফুলকে নির্ধারিত চাল না দিয়ে দেওয়া হয় মাত্র ৭ কেজি। তারপরও চাল ওজনে কম থাকায় সেখানে ইউপি চেয়ারম্যনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে বাঁধে বাকবিতন্ডা। এক পর্যায়ে সাধারণ গরীব এই ভ্যান চালক শরিফুলের হাতে কাঙ্খিত থাপ্পরটি সবার সামনেই হজম করতে হয় চেয়ারম্যানের। এর ঠিক আগের দিনই ঝিনাইদাহ সদর উপজেলার দোগাছি ইউনিয়ন পরিষদে গরীবের জন্য বরাদ্দ আত্মসাৎকৃত ১শ ২ বস্তা চাল কলমনখালী বাজারের পৃথক জায়গা থেকে উদ্ধার করা হয়।
যশোরের চৌগাছার পাশাপোল ইউনিয়নে বরাদ্দকৃত গরীবের ভিজিএফএর চাল কালোবাজারে বিক্রির প্রস্তুতি কালে জনতার হাতে ধরা খায় চেয়ারম্যান অবাইদুল ইসলাম সবুজ। এমপি সাহেব ঘটা করে চাল বিতরনের কার্যক্রম উদ্বোধন করার পরদিনই চেয়ারম্যান মহোদয় এই চাল আত্মসাতের পরিকল্পনা আটেন। যা জনতার হাতে আটকের পরই তার সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এ ঘনায় গোটা উপজেলা জুড়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় শুরু হয়।
লোভ সামলাতে পারেননি যশোরের মনিরামপুর উপজেলার হরিহরনগর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম, যিনি কিনা সদ্য বিজয়ী চেয়ারম্যান। শুরুতেই তিনি গরীবের ৩শ ৩ বস্তা (১৫ টন) ভিজিএফএর চাল আত্মসাৎ বা চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত হলেন। তার চুরি করা চাল ইউনিয়ন পরিষদের সামনেই স্থানীয় নুর ইসলাম নামের এক ব্যক্তির গুদাম থেকে জব্দ করা হয়। পরে উদ্ধারকৃত চাল ইউনয়ন পরিষদের ভিতরে আটকে রেখে সিলগালা করে রাখা হয়। বিষয়টি নিয়ে ঈদের পরেই তদন্তে নামার কথা প্রশাসনের কিন্তু কতটা বাস্তবায়ন হবে তদন্তের কাজে তা দু’চোখ মেলিয়া দেখার অবকাশ।
এভাবে থমকে গেছে গরীবের চাল বিতরণ কার্যক্রম। ভিজিএফের চাল পাচারের ঘটনার বিচার দাবি করে ছাত্র-জনতা বিক্ষোভ মিছিল বের করে কিছু কিছু জয়িগায়, দুঃস্থ নারীরা ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ করেন। এছাড়া ঘটনার সাথে জড়িতদের অপসারণ ও বিচার দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বরাবর জেলা প্রশাসকের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেন অনেক ভূক্তভোগীরা।
জনপ্রতি ২০ কেজি করে চাল বরাদ্দ থাকলেও ১৬ থেকে ১৭ কেজি করে চাল দেওয়ার অভিযোগ উঠে প্রত্যেক গ্রামাঞ্চল কিংবা শহরেও। কোন বাটখাড়া দিয়ে না মেপে বালতি দিয়ে আনুমানিক মাপে চাল বিতরণ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে দেশের কোথাও কোথাও দু’পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। ২০ কেজির মধ্যে সাড়ে ১৯ কেজি হতে পারে। তবে ১৬ থেকে ১৭ কেজি হতে পারে না। গরীবের চাল নিয়ে এমন চাটুকারিতা সত্যিই বড় দুঃখ জনক।
এভাবে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে ভিজিএফর চাল পাচার, আত্মসাৎ, কালোবাজারে বিক্রি, ওজনে কমসহ ইউপি সদস্য আটক, হামলা ও মামলার ঘটনা ঘটেছে, সাথে সাথে চাল বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ করে সিলগালা করা হয়েছে চাল মজুদের গোডাউন গুলো। এতকিছুর পরেও সরকারী ভাবে আনা হচ্ছে না কঠোর আইন ও এর সঠিক প্রতিকার ব্যবস্থা। গরীবের চাল বা ভিজিএফএর কার্ড বিতরনে আগামীতে থাকবে কঠোর আইন, শাস্তি ও সঠিক নিয়ম শৃংখলা এমনটা প্রত্যাশা করেণ সচেতন মহল।

