হাফিজুর রহমান.নিজস্ব প্রতিনিধি-টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় ৮ মাসে ৫৭টি হত্যা কান্ডের ঘটনা ঘটেছে। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন উপজেলায় এ হত্যাকান্ড গুলো ঘটেছে। পুলিশ জানিয়েছে, জমি সংক্রান্ত, পূর্ব শত্রæতা ও পারিবারিক কলহের জেরে এসব হত্যা কান্ডগুলো ঘটেছে। তার মধ্যে আলোচিত কিছু হত্যা কান্ড হচ্ছে, ২৮ জুন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে কালিহাতী উপজেলার সল্লা ইউনিয়নের দেউপুর এলাকার নিজ বাড়ির পুকুর থেকে নিখোঁজের একদিন পর আনিসুর রহমান তুলা (৪৫) নামের এক মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষকের হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত আনিসুর রহমান ওই গ্রামের ছাত্তার মাস্টারের ছেলে। পরেদিন শুক্রবার তার স্ত্রী শাহিনা খাতুন বাদি হয়ে কালিহাতী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
১৭ জুলাই মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে নাগরপুর উপজেলার সহবতপুর ইউনিয়নের পাছ ইড়তা এলাকা থেকে সৃষ্টি একাডেমিক স্কুলের ছাত্র মোহাইমিনুল ইসলাম হামিম (১৪) এর হাত-পা বাঁধা গলাকাটা লাশ উদ্ধার করেছে নাগরপুর থানা পুলিশ। এ ঘটনায় হামিমের বাবা শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা কয়েক জনকে আসামি করে নাগরপুর থানায় মামলা করেন। পরে ২৮ জুলাই মোহাইমিনুল ইসলাম হামিম হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। ক্লু লেস হত্যাকাÐের ১০ দিনের মাথায় এ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনসহ একমাত্র ঘাতক ইমনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃত ইমনের কাছ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি, নিহত হামিমের মোবাইল সেট ও সিমকার্ড উদ্ধার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারের পর টাঙ্গাইল সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নওরিন মাহবুবের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিম‚লক জবানবন্দি দেয় ইমন। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে সে এ হত্যাকাÐ ঘটিয়েছে বলে আদালতকে জানায় ইমন। সে উপজেলার সহবতপুর ইউনিয়নের পাছ ইরতা গ্রামের শামছুল হকের ছেলে।
নিহত হামিমের বাবা শফিকুল ইসলাম বলেন, একজন আসামি গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টি জেনেছি। তবে একজনের পক্ষে আদৌ এ হত্যাকাÐ ঘটানো সম্ভব কি না আমার সন্দেহ রয়েছে। এর সঙ্গে আরও যারা জড়িত রয়েছে, আমি তাদের গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছি। আমার ছেলে হত্যার মুল আসামী ধরা ছোয়ার বাইরে। আমরা আসামীদের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধনের আয়োজন করলে সেখানেও পুলিশ বাধা দেয়। মূল আসামীকে আসামীকে আটক করে ফাঁসির দাবি জানাচ্ছি।
গত ২১ জুলাই শনিবার বিকেল ৪ টায় বাসায় সামনে ঘাটাইল উপজেলার সাগরদিঘী ইউনিয়নের বেতুয়া পাড়া গ্রামের মো. ফরহাদ আলী এডভোকেটকে হত্যা প‚র্ব শত্রুতার জেরা হত্যা করা হয়। পরে ৩০ আগস্ট নিহত মো. ফরহাদ আলীর বাবা মো. হাফিজ উদ্দিন বাদী হয়ে সিনিয়র জুডিসিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ঘাটাইল থানা আমলী আদালতে দঃ বিঃ ৩০২/৩৪ ধারায় এই মামলা দায়ের করেন। মামলা নং সিআর ৩৮৯/২০১৮। এ মামলার আসামীরা হচ্ছে সাগরদিঘী বেতুয়া পাড়া গ্রামের মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে মো. রুবেল মিয়া (২৫), মৃত ছায়েদ আলীর ছেলে হেকমত সিকদার (৫০), মৃত রাইজ উদ্দিনের ছেলে সিদ্দিক হোসেন (৫৮), দেলোয়ার হোসেন (৫৫), আফাজ উদ্দিনের ছেলে আজিজুল (৩৫) রাইজ উদ্দিনের ছেলে মো. ফজল হক (৫২) ও সাগরদিঘী গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে রাসেল (৩০)। এ মামলায় প্রধান আসামী মো. রুবেল মিয়া জেল হাজতে রয়েছে।
জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ি ২০১৮ সালে জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত টাঙ্গাইলে ৫৭টি হত্যা মামলা হয়েছে। ওই সব মামলায় ১৮০ জন আসামীর মধ্যে ৯২ জন আসামী গ্রেফতার হয়েছে। ৫৭টি মামলার মধ্যে উদঘাটিত মামলা ৫০ ও অউদঘাটিত মামলা ৭ টি। ১৭ টি মামলার অভিযোগ, ২টি মামলার চ‚রান্ত প্রতিবেদন ও ৩৮টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।
সাবেক পিপি এডভোকেট এস আকবর খান বলেন, প্রেম গঠিত, জমি নিয়ে বিরোধ কারনে বেশির ভাগ হত্যাকান্ড ঘটেছে। দ্রæত ন্যায় বিচার না হওয়ার কারনে অনেক সময় বাদি পক্ষ মামলা চালাতে হতাশ হয়ে পরে। তখন আসামীরা পার পেয়ে যায়। সঠিক সময়ে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি হলে অপরাধীরা অপরাধ থেকে দূরে থাকতো। তাই হত্যাকান্ড রোধে সামাজিক সচেতনা বৃদ্ধি করতে হবে।
এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধতত্ত¡ এবং পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, আমাদের দেশে বিচার না পাওয়ার কারণে অনেকেই মামলা করতে চায়না। অপর দিকে বিচার বিভাগের সঠিক তদন্তের অভাবে অনেক সময় আসামীরা ধরা ছোয়ার বাহিরে থাকে। যার ফলে একের পর এক হত্যা কান্ড ঘটেই চলেছে। যার যার অবস্থান থেকে সঠিক দায়িত্ব পালন করলে প্রতিটি নাগরিক সঠিক বিচার পাবে ও সমাজ তথা দেশ থেকে অপরাধ দূর করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, গত আট মাসে টাঙ্গাইলে ৫৭ টি হত্যাকান্ড হয়েছে। প্রত্যেকটি হত্যা পারিবারিক, সামাজিক, জমি, প্রেম সংক্রান্ত বিষয়ে হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এখনও পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেনি।

