জাহাঙ্গীর আলম, টাঙ্গাইল- টাঙ্গাইলের সর্বত্র এখন আমন ধান কেটে ঘরে তোলার ধুম চলছে। মাঠে-ময়দানে শীত কিংবা রৌদ্র উপেক্ষা করে চাষীরা ক্ষেত থেকে পাকা ধান সংগ্রহ করতে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন। ধান কেটে ঘরে নতুন ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত কৃষাণ-কৃষাণিরা।
অপরদিকে নবান্নের জন্য সারা বছর অপেক্ষায় থাকে কৃষাণ-কৃষাণিরা। নতুন ধানে হবে নবান্ন। নতুন ধানে পিঠা পুলি, পায়েস, মুড়ি মুড়কি আর মোয়াসহ নানা খাবার তৈরি হয় এই নবান্নের দিনে। বাড়িতে বাড়িতে মেয়ে জামাইসহ আমন্ত্রিত হবেন আত্মীয়রা।
সরেজমিনে টাঙ্গাইলের সদর উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, মাঠের পর মাঠ ধান ক্ষেত। সেখানকার চাষীরা ধান কাটছেন এবং ধান তুলছেন। অনেকেই আবার ধান কেটেও ফেলেছেন। ভোর থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত কৃষক-কৃষাণী। কেউ আবার ধান নিয়ে যাচ্ছেন বাড়ির উঠানে। এরপর কৃষকের আঙিনায় ধানের ছড়াছড়ি, গোলা ভরা ধান এবং ধান থেকে চাল। তাই তাদের এখন দম ফেলার ফুরসত নেই।
জানা যায়, গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই যেন নবান্নের আমেজ ছড়িয়ে পড়ছে। ঢেঁকিতে ধান ভেনে আটা করা, আর সেটা দিয়েই তৈরি হচ্ছে পিঠা পুলি। আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে আত্মীয় স্বজনদের।
কৃষকেরা জানান, ধান কাটা শুরু হয়েছে দুই সপ্তাহ আগে। আগামী ১৫ দিন কিংবা মাস খানেকের মধ্যে সব ধান ঘরে চলে আসবে। এবার প্রতি বিঘায় ১৮ থেকে ২০ মণ পর্যন্ত ধান উৎপাদন হয়েছে। বাজারে এখন প্রতি মণ নতুন ধান বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ থেকে ৮০০ টাকায়। ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকদের মুখে মুখে এখন হাসির ঝিলিক। এবার জেলায় ব্রি-৪৯, ব্রি-৫১, পাজাম, আবছায়া ও স্বর্ণা ধান চাষ হয়েছে বেশি। এসব জাতের চাল সুস্বাদু ও চিকন হওয়ায় হাটবাজারে চাহিদা রয়েছে। এ ব্যাপারে কৃষাণী কদ বানু বলেন, নবান্ন উৎসব আসলে আমাদের কাজের চাপ বহুগুনে বেড়ে যায়। মাঠে কাজ করার পাশাপাশি বাড়িতেও কাজ করে থাকি। নতুন ধান দিয়ে তেলের পিঠা, ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, দুধের পিঠাসহ হকের রকমের পিঠা তৈরি করে আত্মীয়-স্বজন নিয়ে ভোজন করবো।
একই এলাকার কৃষক জালাল মিয়া বলেন, এ বছর আমি তিন বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছি। তিন বিঘায় আমার প্রায় ১৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আবহাওয়া প্রতিকূলে ও পোকার আক্রমন না থাকায় আমার ধান খুব ভাল হয়েছে। আশা করছি তিন বিঘায় প্রায় ৫০ মন ধান পাবো। ফলন ভাল হওয়ায় আমি খুব খুশি। অপর কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা নিজেদের উদ্যোগে ধান চাষ করি। কৃষি অফিস থেকে সহযোগিতা করলে আমাদের অনেক উপকার হতো। সঠিক সময়ে সঠিকভাবে চাষাবাদ করতে পারতাম। তবে আমরা কোন বিনামূল্যে সার ও বীজ এ বছর পাইনি।
টাঙ্গাইল জেলা কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, জেলায় এবার আলই-হালাই, বিন্নি, কালিজিরা, নাইজার শাইল, বাশিরাজ, তুলসিমালা, স্বর্ণালতা, গাইনঞ্জা, পাজাম, পাটজাগ, লতিশাইল, ঢেপা, হরি, জামাই আদুরী, লালশাইল, ক্ষিরসাপাত, চিনিগুড়া, রাজভোগ, হাসফুল, চাপালী, হাইব্রিড ধানী গোল্ড, এসএল-৮, বিআর-১১, বিনা-৭, বিআর-১০, ১১,২২,২৩, ব্রিধান ২৯, ৩২, ৩৩, ৩৪, ৩৯, ৪০, ৪১, ৪৬, ৪৯, ৫১, ৫২, ৫৬, ৫৭, ৬২, স্বর্না, পাজাম, হরিধান, মাধমী জাতের ধান আবাদ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল জেলা কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুল রাজ্জাক বলেন, পোকা মাকড়ের আক্রমণ না থাকায় টাঙ্গাইলে এ বছর আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। এ বছর রোপা আমনের টার্গেট ছিল ৮৩ হাজার ৮৬২ হেক্টর। কিন্তু বন্যা না হওয়ার কারণে টাঙ্গাইলে ৯৭ হাজার ৭০৯ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের চাষ হয়েছে। অপরদিকে বোনা আমনের টার্গেট ছিল ২৯ হাজার ২১ হেক্টর জমিতে। ধানের চারা রোপনের সময় বৃষ্টি হওয়ার কারণে টাঙ্গাইলে এ বছর ২৫ হাজার ৮০ হেক্টর জমিতে বোনা আমনের চাষাবাদ হয়েছে। সবমিলে এ বছর উৎপাদনের টার্গেট ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল। আমরা আশা করছি সব মিলে এ বছর ২ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হবে। তিনি আরও বলেন, মাঠ পর্যায়ে আমাদের উপজেলা কৃষি অফিসার ও কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন। তারা বিভিন্নভাবে কৃষকদের পরার্মশ দিচ্ছেন।

