পুলিশের সাহসী ভূমিকায় নিয়ন্ত্রণে সালথার রণক্ষেত্র - SHOMOYSANGBAD.COM

শিরোনাম

Wednesday, April 07, 2021

পুলিশের সাহসী ভূমিকায় নিয়ন্ত্রণে সালথার রণক্ষেত্র




ফরিদপুর প্রতিনিধি : 

ফরিদপুরের সালথায় থানা ঘেরাও করার পর সরকারি অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগকালে সংঘর্ষে দুজন নিহত এবং র‍্যাব ও পুলিশের আটজন আহত হয়। সোমবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে এ সংঘর্ষ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি চলে রাত প্রায় ১টা পর্যন্ত। এ সময় উত্তেজিত জনতা আগুন জ্বালিয়ে দেয় বিভিন্ন সরকারি অফিস, অন্যদিকে হামলাকারীদের নিবৃত্ত করতে পুলিশ মুহুর্মুহ গুলি ও টিয়ার সেল বর্ষণ করতে থাকে। ফলে এক চরম আতঙ্কজনক পরিস্থিতির মাঝে রাত কেটেছে সালথাবাসীর। বিকট সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশের উপজেলাতেও। ফরিদপুর পুলিশ লাইন্স ও আশেপাশের জেলা হতে আসা বিপুল সংখ্যক পুলিশের বুদ্ধিদীপ্ত সাহসীকতায় ওই গভীর রাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। মঙ্গলবার সকালে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশসহ বিজিবি ও র‌্যাব মোতায়ন করা হয়েছে। 

ঘটনার প্রথমেই খবর পেয়েই ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মোঃ আলিমুজ্জামান ছুটে যান ঘটনা স্থলে। তিনি সেখানে গিয়ে তার সহকর্মিদের নিয়ে একের পর এক বিভিন্ন কলা কৌশল ব্যবহার করে তান্ডবকারীদের পিছু হটান। এসময় পুলিশ ও র‌্যাবের ৮জন সদস্য আহত হয়। তবে যেভাবে প্রথম দিকে ধারনা করা হচ্ছিলো হতাহতের তা কমে আসে মূলত  ফরিদপুরের পুলিশ সুপার এর বুদ্ধিদৃপ্ত সাহসী ভূমিকার কারনে। তার সাহসী ভূমিকার ব্যাপক প্রশংসা করছেন সালথার বিভিন্ন শ্রেনি পেশার মানুষ।

এদিকে হামলায় জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযানে নেমেছে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে গ্রেফতার ও হয়রানি এড়াতে বিভিন্ন এলাকার পুরুষ সদস্যরা বাড়ির বাইরে নিরাপদ অবস্থানে চলে গেছেন। ঘটনার পর বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলার প্রস্তুতি চলছে। ১৩জনকে আটকের খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এ পর্যন্ত একটি। আরো ৫টি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানাগেছে পুলিশ সূত্রে। 

পুলিশের গুলিতে নিহত হয় দুজন তারা হলেন মো: জুবায়ের হোসেন (১৮) ও মিরান(৩৫)।

সরোজমিনে সালথায় গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলা সদরের থানা কার্যালয়, এসিল্যান্ডের অফিস, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ও সরকারি বাসভবন, উপজেলা চেয়ারম্যানের সরকারি বাসভবনে, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ভবনে অবস্থিত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে হামলা হয়েছে বেশি। সেখানে উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের কক্ষেও ভাঙচুর করা হয়েছে। পুরো ভবনের নিচতলার অধিকাংশ দরজা-জানালা ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়েছে। কাগজপত্র ও মালামাল তছনছ করা হয়েছে। এসিল্যান্ড অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়ায় গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র বিনষ্ট হয়েছে। পাশের মুক্তযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অস্থায়ী কার্যালয়ের জানালা ও সাইনবোর্ড ভাঙচুর করা হয়েছে। ইউএনও এবং এসিল্যান্ডের ব্যবহৃত দুটি বিলাসবহুল সরকারি গাড়ি ও দুটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সাতটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়েছে। আর দুটি মোটরসাইকেল হামলাকারীরা নিয়ে গেছে বলে জানা গেছে। এখনো পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। হামলার শিকার এসব স্থানে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মঙ্গলবার সকালে সালথা থানা কার্যালয় চত্বরে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ধ্বংসযজ্ঞে আলামত সংগ্রহ করেছে সিআইডির ক্রাইম টিম। মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান চলছে।

তিনি জানান, সংঘর্ষে পুলিশ ও র‍্যাবের আটজন আহত হয়েছেন। তিনি বলেন, এলাকায় দেড়শ র‌্যাব ও দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়ন হয়েছে। অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঘটনার সময় পুলিশ ৫৫২ রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ করা ছাড়াও লেট বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে। শেষ মুহূর্তে পুলিশ চায়না রাইফেল ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে।

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসিব সরকার বলেন, পুলিশ এবং প্রশাসন ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ করছে বলে ফেসবুক ও স্থানীয় বিভিন্ন লোকজনের মাঝে গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয়। এছাড়া একজন হুজুরকে ধরে নিয়ে গেছে এমন কথাও ছড়ানো হয়। এরপর পুলিশ এবং উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে তারা উপজেলা অফিসের দিকে আসতে থাকে। একপর্যায়ে তারা উপজেলা অফিস চত্বরে প্রবেশ করে উপজেলা কৃষি অফিসের সব কিছু তারা ভাঙচুর করেছে। তারা আমার বাসভবনের দিকে অগ্রসর হলে আমার নিরাপত্তায় যে আনসার রয়েছে তারা গুলি করে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা তাদের উপেক্ষা করে হামলা করে। তারা অতর্কিতভাবে মধ্যযুগীয় কায়দায় আমার বাসভবনে হামলা চালায়। এখানে গ্যারেজে ইউএনও এবং এসিল্যান্ডের সরকারি গাড়ি ছিল সে দুটিও জ্বালিয়ে দেয়। তারা বাসভবনের সব কিছু ভাঙচুর করে।


উপজেলা চত্বরে এবং মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল তাণ্ডবলীলা চালিয়ে ভেঙে ফেলার অভিযোগ করে সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসিব সরকার বলেন, হামলার সময় তারা যে স্লোগান দিয়েছে তাতে বোঝা যায় এর মূল কারণ লকডাউন নয়। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র এবং ধর্মান্ধ গোষ্ঠী বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ভূলুণ্ঠিত করার জন্য এ হামলা করেছে।

প্রসঙ্গত সালথা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসিল্যান্ড মারুফা সুলতানা হীরামণি তার দুজন অধস্তন কর্মচারীকে নিয়ে ফুকরা বাজারে লকডাউনের কার্যকরিতা পরিদর্শনে গেলে সেখানে জনতার প্রতিরোধের মুখে পরেন। এরপর বিক্ষুব্ধ জনতাে ইসলাম ও লাশের গুজব রটিয়ে  আশেপাশের ৮টি ইউনিয়ন থেকে আরো মানুষ তাদের সাথে যোগ দেয়। এরপর গভীর রাত পর্যন্ত চলে তাণ্ডব।

No comments:

Post a Comment