নাম পাল্টে ভারতে-ওমানে পালিয়ে বেড়াতেন শিবির ক্যাডার ম্যাক্সন | সময় সংবাদ |
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
কখনো রঙমিস্ত্রি, কখনো মাছ বেপারী। কখনো নূর নবী, কখনো ম্যাক্সন কিংবা তমাল চৌধুরী। একেক পেশা, একেক নামে যার পরিচিতি; তিনি চট্টগ্রামের পুলিশের তালিকাভুক্ত শিবির ক্যাডার। গ্রেফতার এড়াতে দেশ ছেড়ে কখনো ওমান, কখনো ভারতে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন তিনি। পেশার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে নেন নাম, তৈরি করেন পরিচয়পত্র-পাসপোর্ট।
তবে পরিচয়, পেশা ও দেশ সবকিছু পাল্টেও নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি চট্টগ্রামের দুর্র্ধষ এ শিবির ক্যাডার। গ্রেফতার হয়েছেন কলকাতা পুলিশের হাতে। শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার বারানগর থানার ডানলপ এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে দেশটির পুলিশের সিআইডি বিভাগ।
ভারতীয় পুলিশ জানায়, বাংলাদেশে ২২টি মামলা রয়েছে ম্যাক্সনের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে ১১টিতে রয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা। নিজেকে বাঁচাতে এক সময় দেশ ছেড়ে ওমান পাড়ি জমান ম্যাক্সন। সেখানে গিয়ে রঙমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। কিন্তু কয়েক বছর আগে তার সহযোগী দুর্র্ধষ সন্ত্রাসী সারোয়ার হোসেন ধরা পড়লে পালিয়ে কলকাতা যান তিনি। নাম পাল্টে হয়ে যান তমাল চৌধুরী। নিউ মার্কেটে শুরু করেন মাছ বিক্রি। মধ্যমগ্রামের এক মহিলার সঙ্গে পরিচয় হয় তার। ডানলপ এলাকায় ভাড়া বাসায় ঐ মহিলাকে নিয়ে থাকতেন।
শুক্রবার তাকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে এসব তথ্য। তার কাছ থেকে তমাল চৌধুরী পরিচয়ের ভারতীয় পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, প্যান কার্ড, আধার কার্ডসহ একাধিক কাগজপত্র ও টাকা উদ্ধার করা হয়।
ভারতে অনুপ্রবেশ, বেআইনিভাবে বসবাস ও জালিয়াতির মাধ্যমে কাগজপত্র তৈরির অভিযোগ আনা হয়েছে ম্যাক্সনের বিরুদ্ধে। তার ব্যাপারে কলকাতার ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে দেশটির পুলিশ।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন বলেন, ম্যাক্সনকে ভারতে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। যথাযথ প্রক্রিয়ায় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
বায়েজিদ বোস্তামী থানার জাহানপুর আলতাফ মিয়া বাড়ির আবদুল লতিফের ছেলে ম্যাক্সন। তার বিরুদ্ধে ৫টি অস্ত্র মামলা ও ১৭টি চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে। ২০১১ সালে একটি ডাকাতির মামলায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ম্যাক্সনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তার দেওয়া তথ্যে বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকা থেকে দুই সহযোগী সারোয়ার ও গিট্টু মানিককে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে একে-৪৭সহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
এরপরই আলোচনায় আসে ম্যাক্সন-সারোয়ার জুটি। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ হোসেন খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন তারা। পরে সাজ্জাদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলে কারাগারে থাকা শিবিরের আরেক সন্ত্রাসী নাছিরের অনুসারী হয়ে ওঠেন ম্যাক্সন। ২০১৭ সালে জামিনে বেরিয়ে কাতারে পালিয়ে যান ম্যাক্সন ও সারোয়ার। সেখানে বসেই চট্টগ্রামে নিয়ন্ত্রণ করতেন চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। তাদের আরেক সহযোগী ইমতিয়াজ সুলতান ওরফে একরামও কাতারে পাড়ি জমান। চট্টগ্রামে স্কুলছাত্রী তাসফিয়া হত্যা মামলার আসামি তিনি।
২০১৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে এক গাড়ির যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ফোনে চাঁদা দাবি করেন সারোয়ার, ম্যাক্সন ও একরাম। তাদের হয়ে চাঁদাবাজি করতেন অনুসারীরা। তাদের কথামতো চাঁদা না দেওয়ায় একই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর বায়েজিদের নয়াহাটে ঐ ব্যবসায়ীর বাড়িতে পেট্রোলবোমা ছোঁড়া হয়।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী থানায় কোনো অভিযোগ না করলেও এর তদন্ত শুরু করে পুলিশ। একই সময়ে উজ্জ্বল দেওয়ানজী নামে আরেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে শিবির ক্যাডার সাজ্জাদের নামে চাঁদা দাবি করা হয়। তদন্তে নেমে পুলিশ দেখে- কাতারে থাকা সারোয়ার, ম্যাক্সন ও একরামের নির্দেশে উজ্জ্বলের কাছে চাঁদা চেয়েছিল তাদের অনুসারীরা। ২০১৯ বছরের ২৪ অক্টোবর অভিযান চালিয়ে সারোয়ার-ম্যাক্সনের অনুসারী ৫ যুবককে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে দেশে ফিরে এসে গ্রেফতার হন সারোয়ার। সেখান থেকে ভারতে পাড়ি জমান ম্যাক্সন।
