
চট্টগ্রামে ডিজিটাল নামজারিতে ভোগান্তি, ২৮ দিনেও মিলছে না নিষ্পত্তি
মো. নাজমুল হোসেন ইমন, চট্টগ্রাম:
ভূমি ব্যবস্থাপনাকে সহজ, দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে চালু হওয়া ডিজিটাল নামজারি (মিউটেশন) সেবা চট্টগ্রামে কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। নির্ধারিত ২৮ দিনের মধ্যে নামজারি নিষ্পত্তির প্রতিশ্রুতি থাকলেও সার্ভারের ধীরগতি, সফটওয়্যারের ত্রুটি এবং প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে দীর্ঘসূত্রতায় পড়ছেন সেবাগ্রহীতা ও ভূমি কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একটি নামজারি আবেদন নিষ্পত্তির জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে ধারাবাহিক ১৩টি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। আবেদন গ্রহণ, দলিল ও খতিয়ান যাচাই, ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরীক্ষা, নোটিশ, শুনানি, আপত্তি নিষ্পত্তি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতামত এবং চূড়ান্ত অনুমোদন—সবকিছুই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে শেষ ধাপেই সবচেয়ে বেশি জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
প্রক্রিয়ার শুরুতে নাগরিকের অনলাইন আবেদন এসিল্যান্ড কার্যালয়ে পৌঁছানোর পর তা তদন্তের জন্য ইউনিয়ন ভূমি অফিসে পাঠানো হয়। তদন্ত প্রতিবেদন ও কানুনগোর মতামত পাওয়ার পর আবেদনটি পুনরায় এসিল্যান্ডের কাছে ফিরে আসে। এরপর শুনানি শেষে চূড়ান্ত অনুমোদনের কথা থাকলেও প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে অনেক আবেদন মাঝপথেই আটকে যাচ্ছে।
একাধিক ভূমি কর্মকর্তা জানান, চূড়ান্ত অনুমোদনের সময় অনেক ক্ষেত্রে দাগ নম্বরের তথ্যের অসামঞ্জস্য, খতিয়ানের তথ্যগত ত্রুটি কিংবা সার্ভারের সমস্যার কারণে আবেদন পুনরায় শুরু করতে হচ্ছে। কখনো প্রয়োজনীয় অপশন প্রদর্শিত হয় না, আবার কখনো কমান্ড কার্যকর না হওয়ায় একই আবেদন একাধিকবার সম্পন্ন করতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বলেন, সার্ভারের ধীরগতি এখন প্রায় প্রতিদিনের সমস্যা। অনেক সময় একটি ধাপ সম্পন্ন করার পর আবেদন আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তাদের ভাষ্য, স্বাভাবিকভাবে কয়েক মিনিটে শেষ হওয়ার মতো কাজও সার্ভারের কারণে অনেক বেশি সময় নিচ্ছে। কোথাও কোথাও অফিসের ইন্টারনেট সংযোগ ব্যাহত হলে মোবাইল ডেটা ব্যবহার করে কাজ চালাতে হচ্ছে, যা সেবা প্রদানে আরও বিলম্ব সৃষ্টি করছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বর্তমানে ৪ লাখ ২৮ হাজার ৯৮০টি নামজারি আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ হাজার আবেদন নির্ধারিত ২৮ দিনের সময়সীমা অতিক্রম করেছে। বর্তমানে নামজারি আবেদনের গড় অনুমোদনের হার প্রায় ৬৬ শতাংশ।
চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও এলাকার বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “নামজারির আবেদন করার পর নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো অগ্রগতি নেই। অনলাইনে আবেদন করেও বারবার ভূমি অফিসে যেতে হচ্ছে। ডিজিটাল সেবা থেকে যে সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল, তা বাস্তবে পাচ্ছি না।”
আনোয়ারা উপজেলার বাসিন্দা নাছিমা আক্তার বলেন, “আবেদনের অগ্রগতি জানতে গেলে একই উত্তর পাওয়া যায়—সার্ভারের সমস্যা। এতে সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় হচ্ছে।”
চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ভূমি অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সার্ভারের ধীরগতি ও সফটওয়্যারজনিত জটিলতার কারণে আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্বের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সেবাগ্রহীতারা দ্রুত প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান করে প্রতিশ্রুত ২৮ দিনের মধ্যে নামজারি সম্পন্ন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সফটওয়্যারের ত্রুটি দূর করা, সার্ভারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করা গেলে ডিজিটাল নামজারি সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে এবং জনগণের ভোগান্তিও কমে আসবে।
