![]() |
| ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ: পর্যটনের আড়ালে ইয়াবা পাচারের নতুন রুট |
মো. নাজমুল হোসেন ইমন । চট্টগ্রাম:
ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ চালুর ফলে দেশের পর্যটন, যোগাযোগ ও বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ রেলপথকে ব্যবহার করে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক পাচারের প্রবণতা বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং মাদকবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার না হলে ভবিষ্যতে এই রুট সংঘবদ্ধ মাদক চক্রের অন্যতম টার্গেটে পরিণত হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কক্সবাজার দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন হওয়ায় ইয়াবা পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। আগে অধিকাংশ মাদক চালান সড়কপথে পরিবহন করা হলেও সম্প্রতি রেলপথে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক পাচারের একাধিক ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে এসেছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, সড়কপথে নিয়মিত তল্লাশি ও চেকপোস্ট জোরদার হওয়ায় পাচারকারীরা এখন বিকল্প হিসেবে ট্রেন ব্যবহার করছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী চলাচল করায় প্রতিটি লাগেজ ও পার্সেল শতভাগ তল্লাশি করা সম্ভব হয় না। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ চক্র যাত্রীবেশে ইয়াবা, আইস (ক্রিস্টাল মেথ) ও অন্যান্য মাদক চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, পাচারকারীরা শরীরে মাদক বহনের পরিবর্তে নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করছে। কখনো খাবারের প্যাকেটে, কখনো লাগেজের গোপন অংশে, আবার কখনো পরিত্যক্ত ব্যাগ বা অন্যান্য সামগ্রীর ভেতরে মাদক লুকিয়ে পরিবহনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব কৌশল শনাক্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
রেলওয়ে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি এবং বিভিন্ন সময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। তবে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও লাগেজ পরীক্ষা করা প্রযুক্তিগতভাবে বড় চ্যালেঞ্জ। আধুনিক লাগেজ স্ক্যানার, পর্যাপ্ত জনবল এবং উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা থাকলে মাদক পাচার আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।”
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বিমানবন্দরের মতো আধুনিক লাগেজ স্ক্যানিং ব্যবস্থা, ডগ স্কোয়াড, সিসিটিভিনির্ভর পর্যবেক্ষণ এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা না হলে ভবিষ্যতে এই রেলপথ মাদক পাচারকারীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপকে জরুরি বলে মনে করছেন। এর মধ্যে রয়েছে—কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও ঢাকার প্রধান রেলস্টেশনে আধুনিক লাগেজ স্ক্যানার স্থাপন, ট্রেনে ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, নিয়মিত ডগ স্কোয়াডের মাধ্যমে তল্লাশি, সন্দেহজনক লাগেজ ও পার্সেলের বিশেষ পর্যবেক্ষণ এবং যাত্রীদের মধ্যে সচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার করা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ দেশের পর্যটন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। তাই এই রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পর্যটনবান্ধব পরিবেশ বজায় রেখে মাদক পাচার প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

