জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিঃ
[১]মাগুরায় বাবার সাথে ফসলি জমির কাজে সাহায্য করছে শিপন বিশ্বাস। করোনায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করলে নিজ গ্রামে চলে যায়। এক বছরের বেশি সময় ধরে সে নিজ বাড়িতেই অবস্থান করছে।নিয়মিত বাবার কৃষি কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখছে। ঢাকার দিকে তাকিয়ে আছে কখন বিশ্ববিদ্যালয় খুলার ঘোষণা আসবে এবং সে কখন ফিরবে। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানতো আর খুলে না শিপনের মতো আরো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীই ঐ পথের ধারে চেয়ে আছে।
[২]দীর্ঘ ১ বছরের বেশি সময় ধরে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের একে অপরের সাথে সরাসরি দেখা, সাক্ষাৎ এবং যোগাযোগ নেই । অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা নিজের জেলায় চলে গিয়েছে । বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তারা শহরে যেতে পারতেছে না।
[৩]অনেকে করোনাকালীন এই ক্রান্তিলগ্নে পরিবারসহ নিজেরা কষ্টে জীবনযাপন করতেছে।
কেউই জানেনা দেশ এবং বিশ্ব কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে। তারা কবে পাঠে মনোনিবেশ করবে।পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করে বাবা মায়ের মুখে কখন হাসি ফুঁটাতে পারবে।
[৪]বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেই বিশেষ করে ছেলে শিক্ষার্থীরা কৃষির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। অনেকে ব্যবসার সাথে,অনেকে গৃহের কাজে জড়িয়ে পড়ছে, অনেকে বেকার বসে আছে, অল্পকয়েক করোনার লকডাউনের মধ্যেও ঢাকায় অবস্থান করে টিউশনি করে চলতেছে।
[৫]গত ১৬ ই মে থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থীদের উপর একটি জরিপ চালানো হয়। যেখানে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার শিক্ষার্থীর বর্তমান অবস্থা, আর্থিক এবং সামজিক অবস্থা, পরিবার নিয়ে কিভাবে দিনযাপন করতেছে এবং পড়াশোনার অবস্থা এগুলো নিয়ে গবেষণা করা হয়।
[৬]এই জরিপে বাংলাদেশের যে জেলাগুলোর শিক্ষার্থীরা অংশ নেয় গাইবান্ধা,লালমনিরহাট,কুড়িগ্রাম, চাপাই-নবাবগঞ্জ,রাজশাহী, দিনাজপুর, নাটোর, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, যশোর, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, মাগুরা, খুলনা,সাতক্ষীরা, পিরোজপুর,ভোলা,চট্টগ্রাম, বান্দরবান, ফেনী,কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া,ঢাকা,ফরিদপুর, মাদারীপুর,রাজবাড়ী, টাঙ্গাইল, মাগুরা, গোপালগঞ্জ, শরিয়তপুর, সিলেট,নেত্রকোনা জেলার শিক্ষার্থীরা।
[৭]কুড়িগ্রামের রৌমারি উপজেলার আব্দুল্লাহ আল মামুন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের একজন শিক্ষার্থী। গতবছর মার্চে করোনায় লকডাউন ঘোষণা হলে সেই সময়ে সহপাঠীরা একে একে নিজ বাড়িতে চলে গেলে তিনি ঢাকায় রয়ে যান।মামুন মনে করেছিলো দেখি ঢাকায় থেকে টিউশনিটা কন্টিনিউ করে চলে থাকতে পারি কিনা।এক মাস দুমাস টিউশনি করার পরে তার টিউশনি চলে যায়।করোনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্যে বন্ধ ঘোষণা হলে অনেক শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা গৃহশিক্ষক দ্বারা পড়ানো বন্ধ করে দেয়। মামুন তখন নিজ জেলায় কুড়িগ্রামে চলে আসে। উত্তরাঞ্চলের নদী ভাঙন কবলিত জেলা কুড়িগ্রামে বাবার সাথে কৃষি কাজ করার পাশাপাশি বাড়ির কাজগুলো করে যাচ্ছে। মামুন জানান বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিলে আমাদের জন্যে স্বস্তিদায়ক খবর হয়।আমরা পুনরায় শহরে গিয়ে সেটেল হতে পারি।পরিবারের উপর চাপ কমাতে পারি।
[৮]একই ডিপার্টমেন্টের রায়হানুল ইসলাম, জেলা গাইবান্ধা গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা। করোনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা হলে নিজের জেলায় চলে যায় আর ফিরতে চাইলেও বাস্তবতার কারণে শহরে ফিরতে পারে নি। তিনি তার পিতা না থাকায় বড় ভাইদের সাথে থেকে তাদের ব্যবসায়ীক কাজে সাহায্য সহযোগিতা করে যাচ্ছে। বেশ কয়েকবার ঢাকায় এসে সেটেল হবে এই চিন্তা মাথায় আনলেও এটির বাস্তব রূপ দিতে পারে নি। তিনি তখন মনে করেন আমিতো এই মুহূর্তে ঢাকায় গেলে নতুন করে মেস নিতে হবে। নতুন মেস নিলে নতুন করে আবার এডভান্স পরিশোধ করতে হবে। নতুন টিউশনি খুজতে হবে। আমার কাছে তো কোনো পুঁজি নেই।আমি ঢাকায় ফিরতে চাইলেও সেটা পারতেছি না।
[৯]জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটোরের আরেক শিক্ষার্থী সিহাবও গত বছরে লকডাউনের সময় নিজ বাড়িতে চলে আসে। ২য় বার মার্চে বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে বলে যে প্রবণতা ছিল সেই সময়ে সিহাব ঢাকায় গিয়েছিল থাকার জন্যে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় না খুলায় আবার বাড়িতে চলে আসতে বাধ্য হয়। পরিবারে বাবাই একমাত্র উপার্জনক্ষম হওয়ায় সিহাবের পরিবারে বাড়তি চাপ তৈরী হয়েছে। সিহাব এলাকায় কাউকে টিউশনি করে নিজের পকেট খরচটা চালাবে এই সুযোগটি হচ্ছে না। সিহাব বলেন এলাকায় গার্ডিয়ানরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তাদের ছেলেমেয়েদের টিউটরদের কাছে পড়ানোর প্রয়োজন মনে করে না। সিহাব এলাকায় অন্য কিছু করবে সেই সম্ভাবনাটুকু হচ্ছে না। তিনি মনে করেন সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলতেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও স্বাভাবিক গতিশীলতা ফিরে পাওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সচেতন। আমি মনে করি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দিলে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্য বিধি অনুসরণ করা হবে।
[১০]চাঁপাইনবাবগঞ্জের আবু মিস্টার উজ্জ্বল, জাকিয়া,ফিরোজ, সিলেটের শিমু তালুকদার, বান্দরবানের উম্মে মারমা,মাগুরার মামুন,রাজবাড়ীর ইরশাদ বারিসা,টাঙ্গাইলের শাকিল আহমেদ, মাদারীপুরের অনয় দাস,জামালপুরের মুকুল, মানিকগঞ্জের হাসিব, বগুড়ার অপূর্বসহ অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায় এরা প্রত্যেকে বেকার অবস্থায় দিনযাপন করতেছে। একাডেমিক পড়াশোনা হচ্ছে না, কিছুদিন অনলাইনে ক্লাস চালু থাকলেও এখন আর হচ্ছে না।যদিও সেই অনলাইন ক্লাস ভালো নেটওয়ার্ক এবং ভালো ডিভাইস অনেকের না থাকায় ক্লাসগুলো করতে পারে নি।
[১১]মার্চে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা হলে শিক্ষার্থীরা বাড়িতে চলে আসে। তারা হয়তো ভেবেছিল অল্প দিনেই আবার ঢাকায় ফিরবে।এর জন্যে তারা একাডেমিক বইগুলো নিয়ে যায় নি। এখনতো আর ঢাকায় ফিরতে পারছে না নতুন সেমিস্টার বইগুলো কিনতে পারছে না। অর্থাৎ পড়াশোনার বাইরে হেলায় ফেলায় তাদের দিন কাটছে।
[১২]অন্যদিকে ৮০ জন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩ জন শিক্ষার্থী ঢাকায় টিউশনি করে চলতেছে। বাকি অল্প কয়েকজন পরিবার নিয়ে ঢাকায় অবস্থান করছে যদিও এর সংখ্যা কম।
একই বিশ্বিবদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তরিকুল, শাহরিয়ার, সানজিদ এরা আত্মকর্মসংস্থানের পথ বেছে নিয়েছে। ব্যবসা এবং অনলাইন মার্কেটিং এর সাথে যুক্ত হয়ে পড়ছে।
ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরকারের কাছে তারা দাবিদাওয়া জানিয়েছে যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দ্রুত খুলে দেবার।সকল শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য বিধি মেনে ক্লাস পরীক্ষায় ফিরতে চাচ্ছে।পাশাপাশি সকল শিক্ষার্থীদের ভ্যাকসিনের আওতায় আনার দাবি করেন।

