সময় সংবাদ ডেস্কঃ
সময় সংবাদ ডেস্কঃ
এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) দুজনকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে করা মামলায় সিকদার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রন হক সিকদার ও দিপু হক সিকদারের অব্যাহতি দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে গত ২৭ জুলাই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক মো. রিপন উদ্দিন এই প্রতিবেদন দাখিল করেন।
মঙ্গলবার আদালতের গুলশান থানার সাধারণ নিবন্ধন শাখা সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, এজাহারে উল্লেখ করা আসামি রন হক সিকদার (৪৮) ও দিপু হক সিকদার (৫৩)- দুজনের বিরুদ্ধে পেনাল কোড আইনের হত্যাচেষ্টা অভিযোগসহ, ৩০৭, ৩৬৫ ও ৩৮৪ ধারায় আনা অভিযোগে অভিযুক্ত করার মতো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া ভুল বোঝাবুঝির কারণে ওই মামলা হয়েছে। বাদী ও বিবাদী উভয়পক্ষ নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছে এবং তারা তাদের মধ্যে এরই মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে পরস্পরের সঙ্গে সম্মানের সহিত ব্যবসায়িক সম্পর্কে এগিয়ে যেতে চায় এবং মামলার ফলাফল মেনে নিয়েই এ বিষয়ে পরবর্তীতে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেবে না মর্মে সমঝোতা চুক্তি করেছেন।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি আসামি রন হক সিকদারের দেওয়া তথ্যে বনানী থানা এলাকার ১১ নম্বর রোডের ২৬ নম্বর সিকদার হাউসের আটতলায় রন হক সিকদারের বেডরুমে ওয়্যারড্রোবের ড্রয়ার থেকে একটি লাইসেন্স করা পিস্তল ও দুটি খালি ম্যাগাজিন ও ৭০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এরপর গত ৭ মে পিস্তলটি থেকে কোনো ফায়ার হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করতে বিশেষ পুলিশ সুপার, ফরেনসিকের (সিআইডি) কাছে পাঠানো হয়। পিস্তলটির ব্যালাস্টিক পরীক্ষায়, একে একটি স্ট্যান্ডার্ড পিস্তল, ফায়ারআর্মস বলে উল্লেখ করা হয়। পরে চলতি বছরের ১৫ মার্চ এক প্রতিবেদনে সিআইডি জানায় রাসায়নিক পরীক্ষায় পিস্তলটির ব্যারেলে ফায়ার চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এরপর গত ৭ মে ফায়ার করা হয়েছে কিনা তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়, যা পর্যালোচনা করতে সিআইডির ব্যালাস্টিক ও রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন আদালতে পাঠানো হয়।
চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, এজাহারভুক্ত জামিনে থাকা আসামি রন হক সিকদার ও ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের ব্যাবস্থাপনা পরিচালকসহ ২০২০ সালের ৭ মে এক্সিম ব্যাংক গুলশান সিম্ফনি ভবনে গিয়ে ব্যাংকটির এএমডি ও এমডি মহোদয়কে উল্লেখিত ঠিকানা থেকে অন্য কোথাও নিয়ে গিয়ে থাকলে সে বিষয়ে এক্সিম ব্যাংকের সিসিটিভি ফুটেজ ও আসামি রন হক সিকদার এক্সিম ব্যাংক থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়া প্রস্তাব বিষয়ে কাগজপত্রের সত্যায়িত কপি প্রেরণের জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এক্সিম ব্যাংক বরাবর আলাদা আলাদা চিঠি পাঠানো হয়।
চলতি বছরের ৮ জুন দুটি চিঠিতে জবাব দিলেও ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার বিষয়ে এক্সিম ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোনো কাগজপত্র প্রদান করতে পারেনি।
এছাড়া ২০২০ সালের ৭ মে সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজ ওই বছরের ১৪ জুন সরবরাহ করা হয়, যেন অভিযোগে উল্লেখ করা তারিখে আসামি রন হক সিকদার ও দিপু হক সিকদারের এক্সিম ব্যাংকের গুলশান সিম্ফনি ভবনে উপস্থিতি দেখা যায়নি।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, চলতি বছরের ২০ জুলাই এক্সিম ব্যাংকের কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ মনিরুল ইসলামের স্বাক্ষর করা একটি চিঠিতে ৩০০ টাকা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সমঝোতা চুক্তিতে বলা হয়, মামলার বাদী ও বিবাদী উভয়পক্ষের সাক্ষীদের উপস্থিতিতে একটি সমঝোতা চুক্তি করেন এবং তারা জানান, ভুল বোঝাবুঝির কারণে বাদীপক্ষ বিবাদীদের বিরুদ্ধে অত্র মামলাটি করেন।
এদিকে, গত বছরের ১৯ মে এক্সিম ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গুলশান থানায় রন হক সিকদার ও তার ভাই দিপু হক সিকদারের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলার পর নিজেদের চার্টার্ড বিমানে করে তারা থাইল্যান্ডে পাড়ি জমান। এরপর গত ১০ ফেব্রুয়ারি দুবাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রন হক সিকদারের বাবা সিকদার গ্রুপের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নুল হক সিকদার।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টার দিকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডিবি পুলিশ রন সিকদারকে গ্রেফতার করে। এদিন দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। এ সময় গুলশান থানার হত্যাচেষ্টা মামলায় তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়।
অপরদিকে তার আইনজীবীরা জামিনের আবেদন করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম আশেক ইমাম তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন।
গুলশান থানায় দায়ের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, রন হক সিকদার গত বছরের ৭ মে সকালে ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডিসহ গুলশানে এক্সিম ব্যাংকে আসেন। তারা তাদের প্রস্তাবিত ঋণের টাকার বিপরীতে ‘কো-লেটারেল’ হিসেবে সিকদার গ্রুপের রূপগঞ্জ কাঞ্চন প্রস্তাবিত আদি নওয়াব আসকারী জুট মিলটি পরিদর্শনের জন্য নিয়ে যান এমডি হায়দার আলী ও অতিরিক্ত এমডি ফিরোজকে। ওই স্থানটি পরিদর্শন করে জায়গাটির বর্তমান বাজার দরের সঙ্গে গ্রাহকের বন্ধকী মূল্যের বিশাল ব্যবধান হওয়ায় এক্সিম ব্যাংকের এমডি ও অতিরিক্ত এমডি দ্বিমত পোষণ করেন। এর জের ধরে ‘কৌশলে’ এক্সিম ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পূর্বাচলে নিয়ে ‘হত্যার উদ্দেশে গুলিবর্ষণ’ এবং অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সেখান থেকে বনানী ১১ নম্বরে সিকদার হাউজে নিয়ে ‘হেনস্তা করা হয়’ বলে অভিযোগ করা হয়েছে এজাহারে।
সেখানে বলা হয়, জমির দাম কম বলায় রন ও দীপু এক্সিম ব্যাংকের এএমডি ফিরোজকে ‘মারতে উদ্যত হলে’ তিনি মাফ চেয়ে প্রাণে বাঁচেন। ‘রন হক সিকদার ও দিপু সিকদার (এক্সিম ব্যাংকের) এমডিকে প্রজেক্টের সবকিছু নিয়ম অনুযায়ী আছে ব্যক্ত করে তাদের সাথে থাকা অস্ত্র তাক করে জোরপূর্বক একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেয়।’
এক্সিম ব্যাংকের এমডি, এএমডি ও দুই চালককে প্রায় ৫ ঘণ্টা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রেখে পরে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয় মামলায়।

