জেলা প্রতিনিধিঃ
কিশোরগঞ্জবাসীর অপূর্ণতা পূরণ করতে এবার হাওরে নির্মাণ করা হচ্ছে উড়ালসড়ক। চার হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে নতুন এ প্রকল্প নিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগ। প্রাথমিক কাজ অনেকটা এগিয়েও গিয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্প এলাকার মাটি পরীক্ষার কাজও শেষ হয়েছে। এবার ভূমি অধিগ্রহণের পালা।
সেতু বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, ১৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের উড়াল সড়কটি শুরু হবে মিঠামইন সদর থেকে। মিঠামইনে নির্মাণাধীন সেনানিবাস হয়ে নিকলীর ভাটিবরাটিয়ার উপর দিয়ে এসে এটি শেষ হবে করিমগঞ্জের মরিচখালী এলাকার খয়রত গ্রামে।
সেখান থেকে প্রশস্ত সড়কের মাধ্যমে সংযুক্ত হবে জেলা সদরের সঙ্গে। এই উড়াল সড়ক নির্মাণে নকশা প্রণয়ন এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য পরিকল্পনা প্রণয়নে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগ মঙ্গলবার দুপুরে অংশীজনদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক অবহিতকরণ সভায় প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
করিমগঞ্জের মরিচখালী বাজারে অনুষ্ঠিত এ অবহিতকরণ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনের এমপি এডভোকেট মুজিবুল হক চুন্নু।
কিশোরগঞ্জের ডিসি মোহাম্মদ শামীম আলমের সভাপতিত্বে এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের এমপি রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক, সেতু বিভাগের সচিব আবু বকর ছিদ্দীক, প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদৌস এবং এসপি মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ।
সেতু বিভাগের পরিচালক (উপসচিব) আলতাফ হোসেন শেখ এর সঞ্চালনায় সভায় প্রকল্পের সার্বিক দিক তুলে ধরেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক খান এম আমানত।
এতে অন্যদের মধ্যে করিমগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নাসিরুল ইসলাম খান আওলাদ, নিকলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুস ভূঁইয়া জনি, করিমগঞ্জের ইউএনও মো. আবু রিয়াদ, মিঠামইন সদর ইউপি চেয়ারম্যান এডভোকেট শরীফ কামাল, গুনধর ইউপি চেয়ারম্যান নাজমুল সাকির নূরু সিকদার, দামপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান আবু তাহের, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন মোল্লা সুমন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
মুজিবুল হক চুন্নু এমপি বলেন, হাওরে উড়াল সড়ক হতে পারে এটা এক সময় স্বপ্নের মতো ছিল। উড়াল সড়ক নির্মিত হলে কিশোরগঞ্জ জেলা সদর তথা সারা দেশের সঙ্গে হাওরের তিন উপজেলার স্থায়ী সড়ক যোগাযোগ তৈরি হবে।
রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক এমপি বলেন, রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ইচ্ছায় ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রামের মধ্যে প্রায় ৩০ কিলোমিটার সড়ক নির্মিত হয়। ২০১৬ সালে এটির নির্মাণকাজের উদ্বোধনও করেন রাষ্ট্রপতি। এই সড়কের সঙ্গে কিশোরগঞ্জ ও সারা দেশের সরাসরি সংযোগ স্থাপনের আগ্রহের কথা রাষ্ট্রপতিই জানিয়েছিলেন। এরপরই সেতু বিভাগ উড়াল সড়ক নির্মাণে তৎপর হয়।
উড়াল সেতুটি দ্রুত বাস্তবায়নে সরকারের উচ্চপর্যায়ের তাগিদ রয়েছে, এমন তথ্য দিয়ে সেতু বিভাগের সচিব আবু বকর ছিদ্দীক বলেন, মিঠামইন থেকে করিমগঞ্জের মরিচখালীর খয়রত গ্রাম পর্যন্ত মূল উড়াল সেতুটি হবে ১৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের। প্রকল্পের অধীন মরিচখালি থেকে কিশোরগঞ্জ সদরের নাকভাঙ্গা পর্যন্ত সড়কটি প্রশস্ত করা হবে। প্রকল্পটির নির্মাণে চার হাজার কোটি টাকারও বেশি খরচ হবে। পুরো টাকা সরকারের রাজস্ব খাত থেকে ব্যয় করা হবে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক খান এম আমানত বলেন, এর আগে হাওরে যেভাবে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে, তাতে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ক্ষতিকর প্রভাব আছে। এ জন্যই হাওরে উড়াল সড়ক করা হচ্ছে। এতে পানির প্রবাহ ঠিক থাকবে। জীববৈচিত্র্যে প্রভাব ফেলবে না। উড়াল সড়কটি নির্মাণে হাওরের জনজীবনের মান উন্নত হবে বলেও জানান তিনি।
এর আগে হাওরবাসীর দুঃখ ঘুচাতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এঁর অভিপ্রায় অনুযায়ী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার মধ্যে সারা বছর চলাচলের লক্ষ্যে ৮৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক নির্মাণ করা হয়।
২০১৬ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ আনুষ্ঠানিকভাবে ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক প্রকল্পের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। নির্মাণ কাজ শেষে ২০২০ সালের ৮ অক্টোবর সড়কটির উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গভীর হাওরের তিন উপজেলা ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগের জন্য তৈরি করা সড়কটি এখন সৌন্দর্যপিপাসুদের কাছে হয়ে ওঠেছে এক দুর্নিবার আকর্ষণের নাম।
সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে এরই মাঝে আগামীর পর্যটন ঠিকানা হিসেবে দেশ-বিদেশে পরিচিতি লাভ করেছে সড়কটি। এর মাধ্যমে কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকায় পর্যটন সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
সড়কটি চালু হওয়ার পর হাওরে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটা পাল্টে যায়। দৃষ্টি কাড়ে সারা দেশের মানুষের। ইতোমধ্যে সেটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন ঠিকানায় পরিণত হয়েছে।

