![]() |
| দোয়া ও নফল ইবাদতে হোক নববর্ষের সূচনা |
হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী:
নতুন বছর উপলক্ষে আমাদের প্রত্যাশা—আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন এই আগত বছরকে আমাদের জন্য অফুরন্ত কল্যাণ ও বরকতে পরিপূর্ণ করে দেন। একজন মুমিনের কাছে নববর্ষ মানে কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে যাওয়া নয়; বরং এটি আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে অনেকেই সারা রাত জাগতিক আনন্দ-উল্লাস, হৈ-হুল্লোড় ও অনর্থক কর্মকাণ্ডে মেতে ওঠেন। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে এমন কোনো অপকর্ম নেই, যা এই রাতে সংঘটিত হয় না। অথচ আমাদের উচিত ছিল ভাবা—আমাদের জীবনের আরেকটি বছর শেষ হয়ে গেল, আমরা কী পেলাম, কী হারালাম?
নতুন বছরে প্রবেশের প্রকৃত করণীয় হলো সৃষ্টিকর্তার দরবারে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন, নিজের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং আগত বছর যেন দ্বীন ও দুনিয়া উভয় ক্ষেত্রেই কল্যাণকর হয়—এই দোয়া করা।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন— “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট মাস গণনায় মাস বারোটি—যেদিন তিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।”
(সুরা তাওবা: ৩৬)
আরও ইরশাদ হয়েছে— “তিনি সূর্যকে তেজস্কর ও চন্দ্রকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং তাদের জন্য মঞ্জিল নির্ধারণ করেছেন, যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পারো।”
(সুরা ইউনুস: ৫)
নববর্ষের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যা আমাদের আমলনামাকে কলঙ্কিত করে। হজরত আলী (রা.) বলেছেন—
“রাতের আঁধারে এমন কোনো কাজ করো না, যার কারণে দিনের আলোয় মুখ লুকাতে হয়।”
একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো—সে প্রতিটি সময়কে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহের সুযোগ হিসেবে দেখে। সে হিসাব করে দেখে—গত বছরে সে কী অর্জন করেছে, কী হারিয়েছে, কতটুকু আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পেরেছে।
নতুন বছর বরণ করার উত্তম পদ্ধতি হলো তাহাজ্জুদ নামাজ, নফল ইবাদত, তওবা-ইস্তিগফার ও বিশেষ দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা। আমাদের প্রার্থনা হওয়া উচিত—হে আল্লাহ! আগত বছর যেন আধ্যাত্মিকতার দিক থেকে আমাদের জন্য আরও সমৃদ্ধ হয়।
আমাদের প্রতিটি দিন যেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ অনুযায়ী অতিবাহিত হয়। আমরা যেন পবিত্র কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করতে পারি—এই হোক নববর্ষের অঙ্গীকার।
হজরত ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর দাদার একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য। তিনি পারস্যের নওরোজের দিনে হজরত আলী (রা.)-এর কাছে উপহার পেশ করলে হজরত আলী (রা.) বলেছিলেন— “নওরোজুনা কুল্লা ইয়াওম”—মুমিনের প্রতিটি দিনই নববর্ষ।
অর্থাৎ, একজন মুমিন প্রতিদিনই নিজের আমলের হিসাব নেয় এবং নতুন উদ্যমে আখিরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
যদি আমাদের বছরের সূচনা হয় উত্তম কাজ ও খাঁটি নিয়তের মাধ্যমে, তবে ইনশাআল্লাহ পুরো বছরই হবে শান্তি ও কল্যাণময়। জাগতিক উল্লাসে ডুবে না থেকে আল্লাহর স্মরণে বছর শুরু করাই একজন মুমিনের জন্য সর্বোত্তম পথ।
আল্লাহ তায়ালা ইংরেজি নববর্ষকে আমাদের দেশ, জাতি ও সমগ্র মানবজাতির জন্য কল্যাণময় করুন। বিশ্বমানবতাকে সকল বিপদ ও অকল্যাণ থেকে রক্ষা করুন—এটাই আমাদের আন্তরিক দোয়া।
লেখক পরিচিতি:
হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট
সাবেক ইমাম ও খতিব, হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার জামে মসজিদ, কদমতলী, সিলেট
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট

