![]() |
| আসুন সবাই মিলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করি |
বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস ২০২৬: সচেতনতা ও প্রতিরোধেই বাঁচতে পারে হাজারো প্রাণ
নিকোলাস বিশ্বাস:
২৫ জুলাই পালিত হচ্ছে বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস ২০২৬। এ বছরের প্রতিপাদ্য “Unite to Turn the Tide”, যার বাংলা ভাবার্থ—“আসুন, সবাই মিলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর স্রোত থামাই।” দিবসটি উপলক্ষে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিবছর হাজারো মানুষের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল ভিডিও, নতুন করে আলোচনায় পানিতে ডুবে মৃত্যু:
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সিসিটিভি ভিডিও দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি শিশু পুকুরে ডুবে যাওয়ার সময় বাঁচার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে। পাশে থাকা আরেকটি শিশু চিৎকার করে সাহায্য চাইছে এবং বিভিন্ন বস্তু পানিতে ছুড়ে বন্ধুকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। আশপাশে মানুষ থাকলেও কেউ তার আর্তনাদ শুনতে পায়নি। পরে একজন ব্যক্তি উদ্ধার করতে এগিয়ে এলেও শিশুটির শেষ পরিণতি ভিডিওতে দেখা যায়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বাংলাদেশের বাস্তব চিত্রেরই প্রতিফলন।
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৮ হাজার মানুষের মৃত্যু:
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৮ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যান, যার বড় অংশই শিশু ও কিশোর-কিশোরী। বিশেষ করে বরিশাল অঞ্চল এ ধরনের দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য বলছে, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ মানুষ পানিতে ডুবে মারা যান এবং এর প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটনাই ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় নীরব ঝুঁকি:
জাতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ পানিতে ডুবে যাওয়া। গ্রামীণ এলাকায় অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে বাড়ির পাশের পুকুর, ডোবা বা ছোট জলাশয়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় অভিভাবকেরা গৃহস্থালি বা কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকায় শিশুরা অনেক সময় নজরদারির বাইরে চলে যায়। মাত্র কয়েক মিনিটের অসতর্কতাই ডেকে আনতে পারে অপূরণীয় ক্ষতি।
কেন এত মৃত্যু?
বাংলাদেশের নদী, খাল, বিল, হাওর, পুকুর এবং বর্ষাকালীন জলাবদ্ধতা পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ছোট শিশুদের কৌতূহল, পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি এ মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পানিতে ডুবে মৃত্যুকে “নীরব কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সংকট” হিসেবে অভিহিত করেছে।
প্রতিরোধেই সমাধান:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েকটি সহজ পদক্ষেপ গ্রহণ করলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। যেমন—
-শিশুদের কখনোই পানির পাশে একা না রাখা।
-বাড়ির আশপাশের পুকুর ও জলাশয়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করা।
-দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য কমিউনিটি ডে-কেয়ার চালু করা।
-বিদ্যালয়ে সাঁতার শিক্ষা ও পানি নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করা।
-স্থানীয় জনগণকে উদ্ধারকৌশল ও সিপিআর (CPR) প্রশিক্ষণ দেওয়া।
-গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা কার্যক্রম জোরদার করা।
-বাংলাদেশে সফল উদ্যোগও রয়েছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (CIPRB) পরিচালিত 'আঁচল' ও 'সুইমসেইফ' কর্মসূচি ইতোমধ্যে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার কমাতে ইতিবাচক ফল দিয়েছে। এসব উদ্যোগকে জাতীয় পর্যায়ে আরও সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান:
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধকে শুধু স্বাস্থ্য খাতের বিষয় হিসেবে না দেখে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা—এই চারটি খাতের সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনার অংশ করতে হবে।
তাদের ভাষ্য, প্রতিটি শিশুর জীবন অমূল্য। সচেতনতা, নিরাপত্তা শিক্ষা, সরকারি বিনিয়োগ এবং সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর মিছিল অনেকটাই থামানো সম্ভব।

