দেশের নদ-নদী, হাওর-বাওরসহ সব জলাশয়ে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যেত বলেই আমাদেরকে মাছে-ভাতে বাঙালি বলা হতো। গোলার ধান আর পুকুরের মাছ প্রতিটি বাঙালির কাছে যেন ছিল সহজলভ্য। নব্বই দশকেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। একবিংশ শতাব্দি বাঙালি দরজায় যখন থেকে নাড়া দিল, তখন থেকেই মাছে-ভাতে বাঙালি কথাটা যেন হারিয়ে যেতে লাগল। টাঙ্গাইলের বিভিন্ন নদীনালা, খাল, বিল ভরাট ও বেদখল হওয়ায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মাছের আবাসস্থল। কারেন্ট জালের ব্যবহার, কৃষিজমিতে ব্যাপক হারে কীটনাশক ব্যবহার, মা মাছ নিধন ও মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ের পানি দূষিত হচ্ছে। এ কারণে আগের তুলনায় জলাশয়ে মাছ অনেক কমে গেছে বলে মনে করছেন জেলা মৎস অফিসসহ এ অঞ্চলের জেলেরা। এদিকে বিদেশী বিভিন্ন প্রজাতির হাইব্রিড মাছ চাষের ফলে অর্ধ শতাধিক প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব হুমকিতে পড়েছে। এ এলাকার নদ-নদীতে মাছ কমে যাওয়ার ফলে দিন দিন জেলেরা অন্য পেশায় নিয়োজিত হচ্ছেন। অনেকেই অন্য ব্যবসা গাড়ী চালানো ও বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। তবে দরিদ্র জেলেরা অর্থাভাবে অন্য পেশায় যেতে পারছেন না। ফলে তাদের অনেকেই মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। সরেজমিনে দেখা যায়, এক সময় অতি পরিচিত দেশী প্রজাতির মাছ বিশেষ করে মাগুর, চাপিলা, শিং, কৈ, পাবদা, টাকি, শোল, রুই, কাতল, মৃগেল, চিতল, রিটা, বোয়াল, খৈলশার মত সুস্বাদু মাছগুলো এখন আর খুব একট চোখে পড়ে না। আইরকাটা, পুটি, গজার, কাজলি, টাটকিনি, বাঘাইর, গোলসা, টেংরা, চেলা, বেতরঙ্গী, মলা, ঢেলা, কালবাউস, বাইম, বালু খেকো সহ ৪০-৫০ টি জাতের মাছ বিলুপ্তি পথে।
জেলে ল²ণ রাজবংশী বলেন, এক সময় মাছ ধরতে গেলে মাছে নৌকা বোঝায় হয়ে যেত। কিন্তু এখন আগের তুলনায় পাঁচ ভাগের এক ভাগও মাছ ধরা যায় না। খাল-বিলে মাছ কমে যাওয়ায় অনেক জেলে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে দিচ্ছে। আগে খোলা নদী-নালা থেকে স্বাধীনভাবে মাছে ধরে সংসার ভালোভাবেই চলে যেত। এখন মুক্ত নদ-নদীতে আগের মতো মাছ না থাকায় চাষ করা পুকুরে দিনমুজুর হিসেবে মাছ ধরে দিতে হয়। এতে সপ্তাহে দু-একদিন এধরনের পুকুরে মাছ ধরার সুযোগ পেলেও বেশিরভাগ দিন কাটে অবসরে।
বাসাইল উপজেলার খাট্রা এলাকার জেলে বলেন, ‘জালে অহন আর মাছ পাই না। আগে নদীতে গেলেই মাছ পাইতাম। বেলা উঠার আগেই পাড়ার জেলেদের নিয়ে নদীতে যাইতাম। কতো সময় পালানে (পরিত্যক্ত জমি) জাল বাইতাম। ঘণ্টাখানেক জাল বেয়ে দশটার আগেই বাজারে মাছ উঠাইতাম। কাওরে ভাগও দিতে অইতো না। যা কামাইতাম ওতেই সংসার চইলা যাইত। অহন মাছ সব পালা। খোলা পানিতে চাইলেই মাছ পাই না। অহন পালা মাছ মাইরা দিতে অয়। একদিন একজনের পুকুরে পালা মাছ মাইরা দিলে পরের দিন বেকার বইয়া থাকি।’
জেলা মৎস্য অফিস জানায়, জেলায় ৪১ হাজার ৪৯৫টি পুকুর রয়েছে। এছাড়াও বিল ২৯৮টি, বাওড় ৩টি, পেন কালচার ৪টি, ৮টি নদী ও ১২৮টি খাল রয়েছে। এ এলাকায় মাছের চাহিদা ৭৩ হাজার মেট্রিক টন। মুক্ত জলাশয়ে মাছ কমে যাওয়ায় বদ্ধ জলাশয়ে মাছ চাষ বাড়িয়ে মাছের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। বর্তমানে হাইব্রিড বিভিন্ন জাতের মাছ চাষ হচ্ছে। ফলে এসব মাছ চাষের আগে পুকুর ও ডোবার পানিতে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য মেশানোয় মাছ, শামুক ও অন্যান্য জলজ প্রাণির প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম বলেন, কৃষিজমিতে ব্যাপক হারে কীটনাশক ও মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ের পানি দূষিত হচ্ছে। আর এ কারণে আগের তুলনায় প্রাকৃতিক মাছ অনেক কমে গেছে। এক সময় জেলেরাও মাছ ধরে ভালভাবে সংসার চালাতে পারত। কিন্তু এখন তাদের সংসার চালাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, দেশি মাছ সংরক্ষণে হ্যাচারি স্থাপন করা হবে। ইতোমধ্যেই এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অনেককেই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। যেখানে পানি কম থাকে, সেখানে মৌসুমী মাছ চাষ করা হবে বলেও তিনি জানান।


