যে কারণে খুনের পর পোড়ানো হয় ইন্সপেক্টর মামুনের লাশ - সময় সংবাদ | Popular Bangla News Portal

Breaking

Post Top Ad

Responsive Ads Here

বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৯, ২০১৮

যে কারণে খুনের পর পোড়ানো হয় ইন্সপেক্টর মামুনের লাশ

নিউজ ডেস্ক-
ঘটনার রাতে পুলিশের কর্মকর্তা পরচিয়ই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল পুলিশের বিশেষ শাখায় (এসবি) পরিদর্শক পদে কর্মরত মামুন ইমরান খানের (৩৪)। কারণ তাকে হত্যার কোন পরিকল্পনা ছিল না খুনিদের। তারা মূলত মামুনের বন্ধু রহমত উল্লাহকে ব্লাকমেইল করে মোটা অংকের টাকা আদায় করতে চেয়েছিল। কিন্তু রহমতের সাথে মামুন সেখানে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। যার কারণে খুন করা হয় মামুনকে।
এ ঘটনায় গতকাল বুধবার দিবাগত রাতে ডিবির অভিযানে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ৪ জনকে গ্রেফতারের পর উঠে আসে খুনের নেপথ্যের কারণ। গ্রেফতারকৃতরা হলেন- মিজান শেখ, মেহেরুন্নেছা স্বর্ণা ওরফে আফরিন ওরফে আন্নাফি, সুরাইয়া আক্তার ওরফে কেয়া, ফারিয়া বিনতে মীম।  রাজধানীর বাড্ডা ও হাজারীবাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমানবলেন, এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য প্রায় উন্মোচিত হয়ে গেছে। আসামিদের সবাইকে গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। যেকোনও সময় তাদের গ্রেফতার করা হতে পারে।
গত ৮ জুলাই সবুজবাগ এলাকার বাসা থেকে বনানী গিয়ে নিখোঁজ হন পুলিশের বিশেষ শাখার ইন্সপেক্টর মামুন ইমরান খান। পরদিন তার বড় ভাই জাহাঙ্গীর আলম খান বাদী হয়ে সবুজবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি দায়ের করেন।
মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের খিলগাঁও জোনাল টিম রহমত উল্ল্যাহ নামে মামুনের এক বন্ধুকে গ্রেফতার করে। তার দেওয়া তথ্য মতে, ওই দিনই গাজীপুরের কালীগঞ্জের উলুখোলা রাইদিয়া এলাকার রাস্তার পাশে নির্জন একটি বাঁশঝাড় থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। রাজধানীর বনানী থানায় দায়ের করা হয় একটি হত্যা মামলা। ওই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে পরদিন রহমত উল্ল্যাহকে আদালতে সোপর্দ করে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
জানা যায়, রহমত উল্যাহকে গ্রেফতারের পরই মামুনকে হত্যাকাণ্ডের পুরো চিত্র জানতে পারে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়। এরপর ধারাবাহিক অভিযানে একে একে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া এবং লাশ গুমের সঙ্গে জড়িত সবাইকে গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যে রাখা হয়।
এদিকে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার রহস্য উম্মোচন করেন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম-কমিশনার আব্দুল বাতেন।
তিনি জানান, জানান, মাঝে-মধ্যে টেলিভিশনের বিভিন্ন ক্রাইম সিরিয়ালে অভিনয় করতেন এসবির পরিদর্শক মামুন ইমরান খান। সেই সূত্রে ৪-৫ বছর ধরে রহমত উল্লাহ নামে এক ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল। রহমত উল্লাহর পরিচিত মেহেরুন্নেছা স্বর্ণা ওরফে আফরিন ওরফে আন্নাফিও তাদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় অভিনয় করেছেন। রহমত উল্লাহর সঙ্গে আফরিনের মাঝে মধ্যে সেই সুবাদে যোগাযোগ হতো। সেই সূত্রে গত ৮ জুলাই আফরিন রহমত উল্লাকে তার বাসায় জন্মদিনের দাওয়াত দেন।
রহমত উল্লাহ ওই জন্মদিনের অনুষ্ঠানে পুলিশ বন্ধু মামুনকেও যাওয়ার অনুরোধ করেন। আর সেই জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়েই খুন হন পুলিশ কর্মকর্তা মামুন।
তিনি বলেন, রহমত উল্লাহকে ফাঁসিয়ে অর্থ আদায় করা তাদের টার্গেট ছিল। কিন্তু মামুন নিজেকে পুলিশ পরিচয় দেওয়ায় তাদের টার্গেট মামুনের দিকে চলে যায়।
আব্দুল বাতেন আরো জানান, ঘটনার দিন রহমত উল্লাহ তার গাড়ি নিয়ে আফরিনের ঠিকানা অনুযায়ী বনানীর বাসায় যান এবং মামুন মোটরসাইকেল নিয়ে ওই বাসায় যান। এর কিছুক্ষণ পর স্বপন, মিজান, দিদার, আতিক বাসায় ঢুকে তারা অপকর্মে লিপ্ত বলে অভিযোগ করে। তখন মামুন নিজেকে পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয় দিলে তারা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে রহমত উল্লাহ ও মামুনকে বেঁধে মারধর শুরু করে। এক পর্যায়ে মধ্যরাতে মামুন মারা যায়। এতে তারা চিন্তিত হয়ে পড়ে এবং রহমত উল্লাহর বাঁধন খুলে দেয়। তখন রহমত উল্লাহ মামুনকে ডেকে এনেছে বলে সে ফেঁসে যাবে ভেবে রহমত উল্লাহও তাদের সঙ্গে মিলে যায়। পরদিন সকালে মামুনের লাশ বস্তায় করে তারা রহমত উল্লাহর গাড়িতে উঠায়।
এদের মধ্যে স্বপন, দিদার ও আতিক সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন বলে জানা গেছে। তারা গাড়ি নিয়ে রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্টে যায় এবং খাওয়া-দাওয়া করে। মিজান লাশটি পুড়িয়ে ফেলার পরিকল্পনা করে এবং ক্যান্টনমেন্টের একটি পাম্প থেকে পেট্রোল কেনে। সন্ধ্যার দিকে তারা গাড়ি নিয়ে কালীগঞ্জের দিকে যায়। এরপর জঙ্গলে লাশ নামিয়ে পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। পরে তারা রহমত উল্লাহকেও মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেন। ১০ জুলাই বাসায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই রহমত উল্লাহকে গ্রেফতার করে ডিবি। পরে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বুধবার তিন নারীসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়।
এ ঘটনায় জড়িত অন্তত আরো চারজনের বিস্তারিত নাম পরিচয় পাওয়া গেছে এবং যাদেরকে খুব শিগগিরই গ্রেফতার করা সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেন ডিবির ঊর্দ্ধতন এই কর্মকর্তা।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আব্দুল বাতেন বলেন, তারা বনানীর ওই বাসাটি দুই মাস আগে ভাড়া নিয়েছিল। মানুষকে ফাঁসিয়ে অর্থ আদায় করাই তাদের লক্ষ্য ছিল। আর তাদের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন রবিউল। ওই বাসাটি ভাড়া নিয়েছিল নজরুল নামের একজন। তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নজরুলের সম্পৃক্ততা কেউ স্বীকার করেনি।
অপরদিকে সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা যায়, হত্যাকালে ওই ফ্ল্যাটে এখন পর্যন্ত তিন নারীসহ ১২ জন উপস্থিত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তারা হলো- রহমত উল্লাহ, দিদার, রবিউল, শেখ হৃদয়, আতিক, মিজান, সুরাইয়া আক্তার কেয়া, মেহেরুন নেসা স্বর্ণা ওরফে আফরিন ও ফারিয়া বিনতে মীম। তাদের মধ্যে পেশাদার কয়েকজন ছিনতাইকারীও রয়েছে।
রহমত পুলিশকে জানান, গাজীপুরের কালীগঞ্জের একটি জঙ্গলে মামুন ইমরান খানের বস্তাবন্দি লাশ ফেলে তাতে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে আবার ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়। ঢাকায় আসার পথে রহমত রাস্তায় কৌশলে গাড়িটি দুর্ঘটনার কবলে ফেলে। এ সময় গাড়িতে থাকা প্রতারকচক্রের সদস্যরা দ্রুত নেমে পালিয়ে যায়। এ সময় রহমতও তাদের থেকে আলাদা হয়ে যায়। তার ধারণা ছিল মামুন ইমরান খান হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী না রাখতে তারা রহমতকেও মেরে ফেলবে ওই প্রতারকরা। আর এই ভয় থেকেই সে প্রতারক চক্র থেকে দুর্ঘটনার কৌশল করে পালিয়ে যায়।

Post Top Ad

Responsive Ads Here