সময় সংবাদ ডেস্কঃ
জীবনমানের ক্রমাগত উন্নয়ন হলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরতরা স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে বসবাসে উৎসাহী হয়ে উঠতে পারে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, স্থায়ীভাবে বসবাসে আগ্রহের ফলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করছে, প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জীবনমান ও সুযোগ-সুবিধা যৌক্তিক ও সীমিত পর্যায়ে রাখা প্রয়োজন। এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী সায় দিয়েছেন বলে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রোহিঙ্গা সমস্যা সম্পর্কিত সর্বশেষ পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন সংস্থার অর্থ বরাদ্দ নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার আলোচনা হয়। আলোচনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেয়া প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ফারুক খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির সদস্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, নুরুল ইসলাম নাহিদ, গোলাম ফারুক খন্দকার প্রিন্স, আব্দুল মজিদ খান ও হাবিবে মিল্লাত অংশ নেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো ও জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গাদের জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ক্যাম্পগুলোকে জীবনমান ও সুযোগ-সুবিধাগুলো বৃদ্ধি, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নানাবিধ বহুবার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে বেশি তৎপর হয়ে উঠছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিশেষত ক্যাম্পের জীবনমানের ক্রমাগত উন্নয়ন বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বসবাসে উৎসাহিত এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যাবাসনের স্বার্থে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জীবনমান ও সুযোগ-সুবিধাগুলো যৌক্তিক ও সীমিত পর্যায়ে রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রস্তাব করা হলে প্রধানমন্ত্রী সানুগ্রহ অনুমোদন দিয়েছেন।
শরণার্থীদের আশ্রয়দাতা দেশে অন্তর্ভুক্ত করাসহ একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাবসহ রিফিউজি পলিসি রিভিউ ফ্রেমওয়ার্ক (Refugee Policy Review Framework) নামে ১৬টি দেশের শরণার্থী ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে বিশ্বব্যাংক। তাতে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, কাজ করা, চলাফেরা, জমি কেনা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্পৃক্ত হওয়াসহ সব ধরনের আইনি অধিকার শরণার্থীদের দেয়ার কথা বলা হয়েছে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটির ঢাকা কার্যালয় থেকে ফ্রেমওয়ার্কের বিষয়ে মতামত চেয়ে ৩০ জুন অর্থমন্ত্রী বরাবর পাঠানো হয়।
প্রতিবেদনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেনকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ ক্ষণকালের জন্য আশ্রয় দিচ্ছে এবং স্বদেশে তাদের প্রত্যাবাসন হচ্ছে বাংলাদেশের একমাত্র অগ্রাধিকার।
এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন বলেও জানান। সেই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের ‘শরণার্থী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি, তারা বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক বলেও জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
শরণার্থীদের আশ্রয়দাতা দেশে অন্তর্ভুক্ত করাসহ বিশ্বব্যাংকের একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাবের ঘোর বিরোধিতা উঠে এসেছে সংসদীয় কমিটির বৈঠক থেকেও। এ প্রস্তাবকে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দেয়ার অভিপ্রায় উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেছে। কমিটি বলেছে, রোহিঙ্গাদের জন্য বাড়ি তৈরি বা শিক্ষার সুযোগের নামে বিশ্বব্যাংক যেন ‘ধানাইপানাই’ করতে না পারে।
বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি মুহম্মদ ফারুক খান বলেন, আমরা কমিটিকে বলেছি বিশ্বব্যাংক এ ধরনের ধানাইপানাই করে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করতে চায়। রোহিঙ্গাদের সেটেলমেন্টের জন্য এটা-সেটা প্রস্তাব মানা যাবে না। আমরা স্পষ্টতই এর বিরোধিতা করেছি।
তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বলেছি আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য হবে, আমরা তাদের সাময়িক জায়গা দিয়েছি। আপনারা তাদের মিয়ানমারে ফেরতের ব্যবস্থা করুন। আমাদের এখানে থাকার জন্য তাদের ভবন তৈরি করে দেবেন, তাদের চাকরির সুযোগ করে দেবেন, জমি কেনার সুযোগ দেবেন—এসব ধানাইপানাই নয়। তাদের পড়াশোনার কথা বলছে। সেটা আমাদের এখানকার রোহিঙ্গাদের কেন? মিয়ানমারেই তো এখন ১০ লাখের মতো রোহিঙ্গা আছে, তাদের আগে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করুন। সেখানে দুই বছর এটা চালু করলে দেখা যাবে এটার পরিণতি।
তিনি জানান, সংসদীয় কমিটির অবস্থান হচ্ছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে যেকোনো ধরনের আলোচনায় মন্ত্রণালয় যেন বলে তারা শরণার্থী নয়, বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী। কাজেই আলোচনার প্রথম এজেন্ডা হবে তাদের কীভাবে ফেরত পাঠানো যাবে।
মিয়ানমারে নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন উল্লেখ করে কমিটির সভাপতি বলেন, দেশটির নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন। মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে কবে নাগাদ আলোচনা হতে পারে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিশ্বব্যাংককে বলেছে, তারা আমাদের এসব টাকা দেয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে কেন? এখানে তাদের জমি কেনার কথা বলা হচ্ছে কেন? এ প্রস্তাবগুলো মিয়ানমারকে দেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, আমাদের এখানে ৯-১০ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে, তাদের মধ্যে ৩০০ জনেরও কম আছে যারা গ্র্যাজুয়েট। তাদের তো এই দেশে পড়াশোনা করার অধিকার নেই। বিশ্বব্যাংক চাইলে মিয়ানমারকে টাকা দিক সেদেশের রোহিঙ্গাদের পড়াতে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরা ভাসানচর পরিদর্শনে গিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়েছে উল্লেখ করে ফারুক খান বলেন, তারা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিবেশ আরো ভালো করার কথা বলেছে। কিন্তু আমরা সেটা কেন করব। এখানকার জায়গা সংকটের কারণেই আমরা ভাসানচরে তাদের নিচ্ছি। তাছাড়া এটা আমাদের বনের জমি। তাদের কারণে আমাদের বন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

