
যে কাজ করলে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয় মানুষ: ইসলাম যা বলছে
হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী:
নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারিম। আম্মা বা'দ।
প্রিয় পাঠক, আজকের আলোচনার বিষয়— এমন একটি জঘন্য অপরাধ, যা সংঘটিত হলে আল্লাহর রহমত থেকে মানুষ বঞ্চিত হয় এবং যার ভয়াবহ পরিণতির কথা কোরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলার সাহায্য কামনা করে বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।
বর্তমান সময়ে গুম, খুন ও হত্যা যেন নিত্যদিনের সংবাদে পরিণত হয়েছে। অথচ ইসলাম অন্যায়ভাবে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়াকে অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে। নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, আর এ ধরনের অপরাধ আল্লাহর কাছে অত্যন্ত ঘৃণিত।
পবিত্র কোরআনে মানুষের জীবন রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা না করতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাত বন্ধ করতে কিসাসের বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ বলেন,
“হে ঈমানদারগণ! নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের জন্য কিসাস বিধিবদ্ধ করা হয়েছে—স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, দাসের বদলে দাস এবং নারীর বদলে নারী।” সুরা আল-বাকারা: ১৭৮)
বর্তমান সময়ে দেশ-বিদেশে গুম, খুন ও হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। অথচ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, কোনো মুসলমানকে তিনটি কারণ ছাড়া হত্যা করা বৈধ নয়।
প্রথমত, যদি সে অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে; দ্বিতীয়ত, বিবাহিত হওয়ার পর ব্যভিচার করে; এবং তৃতীয়ত, ইসলাম ত্যাগ করে প্রকাশ্যে মুরতাদ হয়ে যায়। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
তবে এসব বিষয়ে বিচার ও শাস্তি কার্যকর করার দায়িত্ব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়; এটি কেবল বৈধ রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার এখতিয়ার। ব্যক্তি উদ্যোগে কাউকে হত্যা বা শাস্তি দেওয়া ইসলামে বৈধ নয়।
আজ বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক মানুষকে এমন সব অভিযোগে হত্যা করা হয়, যার কোনো ইসলামী ভিত্তি নেই। গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ইসলামের শিক্ষা ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেছেন, “একজন মুমিন ততক্ষণ পর্যন্ত তার দ্বীনের ব্যাপারে প্রশস্ত অবস্থায় থাকে, যতক্ষণ না সে অবৈধভাবে কাউকে হত্যা করে।”
(সহিহ বুখারি)
এ থেকে বোঝা যায়, অন্যায় হত্যাকাণ্ড এমন একটি অপরাধ, যার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর বিশেষ রহমত থেকে দূরে সরে যায় এবং তার ঈমানি জীবনে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে।
এ কারণে সমাজে শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য গুম, খুন ও হত্যার মতো অপরাধ থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব। ইসলামের শিক্ষা মানুষকে জীবন রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং পারস্পরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও সতর্ক করে বলেছেন, “কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম যে বিষয়ে বিচার হবে, তা হলো রক্তপাত (হত্যা)।”
(সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
সুতরাং, কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করতে হলে অন্যায়ভাবে গুম, খুন ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ থেকে নিজেদের বিরত রাখতে হবে। আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া, তিনি যেন আমাদের সবাইকে মানবতার বিরুদ্ধে এসব অপরাধ থেকে হেফাজত করেন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা দান করেন।
আমিন।
লেখক: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট; সাবেক ইমাম ও খতিব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট; ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট।
