
নির্বাচন ঘিরে নাশকতার আশঙ্কা: সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকছে আগ্নেয়াস্ত্র
মো: নাজমুল হোসেন ইমন, স্টাফ রিপোর্টার:
জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নির্বাচনে নাশকতার লক্ষ্যে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দেশে প্রবেশ করছে। এসব অস্ত্র বিভিন্ন চক্রের মাধ্যমে হাতবদল হয়ে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধীদের হাতে পৌঁছাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, দেশের অধিকাংশ অবৈধ অস্ত্র সীমান্ত পথেই প্রবেশ করছে। যদিও সুনির্দিষ্ট রুটের সংখ্যা নির্ধারিত নয়, তবে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, নওগাঁ, যশোর, কুষ্টিয়া, সিলেট ও সুন্দরবন অঞ্চলকে অস্ত্র প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র ঢোকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বান্দরবানের মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত মূলত নাফ নদী, দুর্গম পাহাড় ও ঘন জঙ্গলবেষ্টিত হওয়ায় এর বেশ কিছু অংশ অরক্ষিত। বিভিন্ন সোর্সের তথ্যে জানা যায়, টেকনাফ থেকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি পর্যন্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার থাকলেও অস্ত্রের চালান ঠেকানো পুরোপুরি সম্ভব হচ্ছে না।
সীমান্ত এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, দুর্গম পাহাড়ি পথ ও নদীপথে বিজিবির নিয়মিত টহল রয়েছে। সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে। তবুও চোরাচালান চক্র নানা কৌশলে অস্ত্র পাচার চালিয়ে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সোর্স জানায়, ঈদগড়, বাইশফাঁড়ি, নাইক্ষ্যংছড়ি, ফুলছড়ি, সোনাইছড়ি ও বালুছড়ি সীমান্ত দিয়ে জি-৩, জি-৪ ও চায়না রাইফেলসহ বিভিন্ন অস্ত্র দেশে ঢুকছে। এসব অস্ত্র মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে পাচার হয়ে পরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাঙ্গুনিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়িয়ে এসব প্রাণঘাতী অস্ত্র গ্রাম থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়ছে, বিশেষ করে নির্বাচনের সময় এসব অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে কক্সবাজারে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র মজুতকারী একটি চক্রের সন্ধানও পাওয়া গেছে। চক্রের এক সদস্য দাবি করেন, ডাকাতি, দখল-বাণিজ্য ও নির্বাচনের আগে প্রভাব বিস্তারের কাজে এসব অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম নয় মাসে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে এক হাজার ২০০টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। সম্প্রতি মিয়ানমার সীমান্তে পরিচালিত অভিযানেও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।
অস্ত্র চোরাচালান প্রতিরোধে পদক্ষেপ সম্পর্কে কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেন, “এটি একটি জটিল সীমান্ত। বর্তমানে ওই এলাকায় সরকারি বাহিনীর অনুপস্থিতি এবং নন-স্টেট অ্যাক্টরের তৎপরতা চোরাচালান রোধে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৫৩ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান জানান, অস্ত্রসহ সব ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে টহল ও অভিযান দ্বিগুণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নাইট ভিশন ডিভাইস ব্যবহার ও গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক মো. তৌফিকুর রহমান বলেন, অবৈধ অস্ত্রের মজুত নির্বাচনকে সহিংসতার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এ জন্য নির্বাহী বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ এবং গোয়েন্দা সংস্থার সক্রিয় ভূমিকা জরুরি।
র্যাব-৭-এর একটি সূত্র জানায়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সহিংসতার উদ্দেশ্যে অস্ত্র মজুতের তথ্য পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
