করোনা আইসোলেশনে ডিউটি করা এক করোনা যোদ্ধার গল্প - সময় সংবাদ | Popular Bangla News Portal

Breaking

Post Top Ad

Responsive Ads Here

শুক্রবার, মে ০১, ২০২০

করোনা আইসোলেশনে ডিউটি করা এক করোনা যোদ্ধার গল্প

 গত বৃহস্পতিবার তিন করোনা রোগি সুস্থ্য হয়ে বাড়ি যাওয়ার সময়

সঞ্জিব দাস, ফরিদপুর থেকে :
প্রথমদিন গত ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার সকালে যখন হাসপাতালের করোনা ডিউটিতে যাচ্ছিলাম, তখন অজানা আশঙ্কা ও ভয়ে বুক ধুকধুক করছিল। বারবার চোখের সামনে বিদেশে থাকা স্বামী ও দুই ছোট্র কন্যা নুসরাত ও মারিয়ার চেহারা ভেসে আসছিল। আইসোলশন ওয়ার্ডে মুমূর্ষু রোগীর সেবা করতে গিয়ে আমিও আক্রান্ত হলে, আমার কিছু হয়ে গেলে ওদের কী হবে! তবুও কর্তব্য পালনে ব্রত নিয়ে নিজ থেকে করোনা ইউনিটের দায়িত্ব চেয়ে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাই। আইসোলেশনে ডিউটি করার জন্য বিশেষ ধরনের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পা থেকে মাথা পর্যন্ত) মাস্ক ও চোখে গ্লাস পরার পর কোনোভাবেই শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারছিলাম না প্রথমদিকে।’ তারপরও পিপিই ও মাস্ক পরে করোনা ডিউটি নিয়ে আইসোলশনে প্রবেশ করি। এভাবে রোগিদের সেবা করতে গিয়ে গিয়ে দিনকে দিন থেকে কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে যাই।’ 


এভাবেই ওই সাহসী নার্স শুক্রবার (১লা মে) সকালে ফরিদপুরের করোনা রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ডিউটি করা সাহসী সেবিকা আফসানা আক্তার করোনা রোগীদের সেবা নিয়ে বিশদ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করছিলেন।


তিনি বলেন ‘আইসোলেশনে ডিউটি করার সময় খুব কাছে থেকে করোনা রোগীদের শ্বাসকষ্ট ও জ্বর নিয়ে ছটফট করতে দেখেছি। ১০দিন ডিউটি শেষে হোম কোয়ারেন্টাইনে এসেছি। জানি না আমি নিজেই করোনা আক্রান্ত কি-না। এখন দিন গুনছি কবে ১৪ দিন শেষে পরিবারের কাছে যেতে পারব।’ তারপর ৭দিন ছুটি নিয়ে পরিবারের কাছে থাকবো। এরপর আবার মানবিক এই কাজে করোনা রোগিদের সেবা করার জন্য ফিরে আসতে চাই। আমি এবং আমরা চাই মানবিকভাবে এই বিপর্যয়ে করোনা আক্রান্তদের পাশে থাকতে। সেবা করতে গিয়ে সব ভুলে গিয়েছি। নিজেরা রোগির সেবায় আত্মনিয়োগ করেছি। 


সাহসী এই সেবিকা নিজেই চেয়ে নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন তার সাথে ডিউটি করা আরো ৫জন সহকর্মিদের সাথে। তিনি এই বিপদকালিন সময়ে তার সহকর্মিদের সাথে নিয়ে এই যুদ্ধ রুখতে দৃঢ় সংকল্প। বিশেষ করে তার সাথে দায়িত্ব পালন করা সেবিকা কাকলি খাতুন, ফারজানা, লাভলি, রেহেনা ও  মিনারা ওদের ধন্যবাদ দেন। তিনি বলেন এই সময়ে ওদেরকে পেয়ে কাজ করতে আমার অনেক সহজ হয়েছে।  


তবে তিনি তাদের জন্য দেয়া বরাদ্দকৃত খাবারের মান এবং একই ধরনের প্রতিদিন খাবার দেওয়ার ব্যাপারে তাদের ক্ষোভের কথা জানান। তিনি বলেন, প্রতিদিন আমাদের জন্য পাচঁশত টাকা খাবারের জন্য বরাদ্দ থাকলেও দেয়া হচ্ছে কম দামের নি¤œ মানের খাবার। এই ব্যাপারটি উন্নত হওয়া খুবই দরকার, না হলে আমাদের শরীরের সমস্যা তৈরি হতে পারে। অন্যসব বিভাগের খাবার মান থেকে করোনা যোদ্ধা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সকলের খাবার মান উন্নত হওয়া প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে বলে তিনি জানান। এর ভিতর সকালে আমাদের জন্য কোন নাস্তার ব্যবস্থা নেই। কোন মতে সকালে নিজেদের মুড়ি চিড়া খেয়ে দুপুর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছি বলেও তিনি জানান।   


তিনি বলেন, ‘গত ১০ দিনে তিনি আইসোলেশন ওয়ার্ডে পাচঁজন করোনা রোগীকে খুব কাছে থেকে (ক্লোজ কন্টাক্ট) চিকিৎসা দিয়েছেন। পাচঁজনের এর ভিতর তিনজন সেবাকালিন সময়ে সুস্থ্য করে বাড়িতে যেতে সাহায্য করেছেন। তবে তাদের আইসোলশনে থাকার সময়ে গত কদিন আগে দুজন রোগি করোনা উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়ে মৃত্যু বরন করেন। তিনি বলেন আমরা প্রথম থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম তারা করোনা রোগি নই। তারপরও তাদের এখানে রেখে চিকিৎসা করানো হলো যা মেনে নিতে পারেনি সে সময়। এ সময় কর্তব্যরত নার্সরা সার্বক্ষণিক তাদের পাশে ছিলেন। এক্ষেত্রে চিকিৎসকরাও তাদের সার্বিক সহযোগিতা করেছেন।’ তারপরও তাদের বাচাঁনো যায়নি। 


দশ দিন ডিউটি শেষ করে ওই নার্স এখন ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন হাসপাতালের কোর্য়াটারে। কোয়ারেন্টাইন শেষ না হলে তিনি পরিবারের কাছে যেতে পারছেন না।

                               কন্যাদের সাথে আফসানা-

এখন হাসপাতালে বসে স্বামী ও কন্যাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। পাচঁ বছরের ছোট্র মেয়েটি যখন মা বলে ডেকে ওঠে তখন বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। কিন্তু এ মুহূর্তে কাছে গেলেই সংক্রমিত হতে পারে-এ আশঙ্কায় বুকে পাথর বেঁধে অপেক্ষা করছেন।
 

দুই কন্যা পরিবারকে ফেলে ডিউটি করার জন্য তার মোটেও খারাপ লাগেনি। বরং পেশাদার নার্স হিসেবে মুমূর্ষু রোগীর সেবা করতে পেরে নিজেকে গর্বিত বলে মনে করেন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা এই সাহসী নার্স।

Post Top Ad

Responsive Ads Here